আলেকজান্ডারের শিবিরে এক আগন্তুক শিশির বিশ্বাস

গাউগামেলার প্রান্তরে আলেকজান্ডারের অশ্বারোহী সেনার ঝটিকা আক্রমণে দোর্দণ্ডপ্রতাপ পারস্য সম্রাটের বিশাল বাহিনী অতি অল্প সময়ের মধ্যেই যখন তাসের ঘরের মতো ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল‚ গ্রিক সৈন্যদের বড় আহ্লাদ হয়েছিল সেদিন। একে তো সুবিশাল পারস্য সাম্রাজ্যকে তখন অপরাজেয় মনে করা হত। তার উপর সেই সাম্রাজ্য ছিল ভারতের অনেকটা অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। মণিপাথর‚ মসলিন‚ ময়ূর আর মশলার দেশ ভারত অভিযানে তাদের সামনে কোনও বাধাই আর রইল না। আহ্লাদ হবারই কথা।

 

গ্রিক সেনাদের সেই আহ্লাদ অবশ্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ভারতের মূল ভূখণ্ডে ঢোকার দরজা খাইবার গিরিপথে পৌঁছোতেই কালঘাম ছুটে গিয়েছিল। শোনা যায়‚ সেই কারণে ফেরার সময় আলেকজান্ডার বাহিনীর একটা বড় অংশকে নিয়ে ঝিলম‚ সিন্ধু প্রভৃতি নদীপথে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেসব ইতিহাসের বইতে আছে। আমি ইতিহাসবিদ নই। বলতে বসেছি অন্য এক গল্প।

আগেই বলেছি‚ যে ধারণা নিয়ে গ্রিক বাহিনী ভারতের দিকে অগ্রসর হয়েছিল‚ তা ভেঙে যেতে সময় লাগেনি। একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তাদের লিপ্ত হতে হয়েছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সংঘর্ষ হয়েছিল সোয়াট উপত্যকায় অশ্বক রাজ্যের রাজধানী মশকাবতী অধিকারের জন্য।

গ্রিক ঐতিহাসিকরা অশ্বক নামে উল্লেখ করলেও মহাভারত প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে আমরা জানি‚ এই অঞ্চল তখন কম্বোজদের অধিকারে। কম্বোজ জাতি শুধু দুর্দান্ত অশ্বারোহী যোদ্ধাই নয়‚ উন্নত মানের অশ্ব উৎপাদনেও তাঁদের সুনাম ছিল। সম্ভবত উপমহাদেশে তাঁরা অশ্বপালক নামেও পরিচিত ছিলেন। গ্রিকরা তাঁদের সেই নামেই উল্লেখ করে গেছেন। সুতরাং রাজধানী মশকাবতী অধিকার করতে গ্রিক বাহিনীকে যে প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল‚ তা বলাই বাহুল্য। গ্রিক ঐতিহাসিকেরাই উল্লেখ করেছেন‚ পাহাড় এবং নদীতে ঘেরা এই রাজ্যে একেই চলাফেরা সহজ ছিল না। তায় পাহাড়ের উপর প্রাচীর ঘেরা সুরক্ষিত রাজধানী ছিল প্রায় দুর্ভেদ্য। শুধু তাই নয়, রাজধানী রক্ষায় অশ্বকরাজ কুড়ি হাজার অশ্বারোহী যোদ্ধা নিয়ে গ্রিক বাহিনীর সম্মুখীন হয়েছিল। সঙ্গে ছিল শিক্ষিত রণহস্তী এবং তিরিশ হাজার পদাতিক।

কম্বোজ সৈন্যর রণকৌশল দেখে স্বয়ং আলেকজান্ডারের কপালেও তখন চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। দিনের পর দিন রাজধানী অবরোধ করেও কোনও সুবিধা হচ্ছে না। শুধু সৈন্যক্ষয়ই নয়‚ যুদ্ধে শত্রুপক্ষের ছোঁড়া তিরের আঘাতে হঠাৎ আহত হয়েছেন নিজেও। সুতরাং সম্রাটের কপালে যে চিন্তার ভাঁজ পড়বে‚ তাতে আশ্চর্য কী! পরের দিন তিনি শিবিরের সুসজ্জিত বস্ত্রাবাসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। সূক্ষ্ম আচ্ছাদনে ঢাকা গবাক্ষপথে ভিতরে নরম আলোয় সুগন্ধি গুগগুলের গন্ধ। পারসিক গালিচার উপর পাতা সুদৃশ্য আসনে বসে রয়েছেন স্বয়ং আলেকজান্ডার। তাঁর বয়স তখন তিরিশের বেশি নয়। একমাথা ঝাঁকড়া চুল গৌরবর্ণ বলিষ্ঠ দেহের মানুষটির দৈহিক আকৃতি বিশাল না হলেও নরশার্দুল বলাই যায়। বৈদ্য ক্ষতস্থান পরিচর্যা শেষ করে অল্প আগে বিদায় নিয়েছেন। কিঙ্কর ব্যজন নিয়ে ব্যস্ত। দুজন সংবাহক সাবধানে তাঁর অঙ্গমার্জনা করে চলেছে।

অন্যদিন এই সময়টা সম্রাট যথেষ্টই উপভোগ করেন। কিন্তু আজ তাঁর কপালে একাধিক কুঞ্চনের চিহ্ন সুস্পষ্ট। তবে তা আঘাতের কারণে নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে এসব চোট–আঘাত বছর তিরিশ বয়সের সম্রাটের নিত্যসঙ্গী। কঠিন পেশিতে অসংখ্য কাটা-ছড়ার দাগ দেখলেই বোঝা যায়‚ এসব কিছুই নয় তাঁর কাছে। আসলে আজ তাঁর কপালের ভাঁজ শুধু যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নয়‚ অন্য আর এক কারণে। সামনে স্বর্ণথালিকায় সোয়াট উপত্যকার অতি উচ্চমানের কয়েক গুচ্ছ আঙুর‚ কয়েক টুকরো কাশ্মীরি আপেল আর আখরোট। এ পর্যন্ত তার কিছুই তিনি মুখে তোলেননি। ওই সময় হঠাৎ প্রতিহার এসে জানাল‚ সেনাধ্যক্ষ ইউডেমাস সম্রাটের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।

অল্প আগে ইউডেমাস সহ কয়েকজন সেনাধ্যক্ষকে সম্রাট নিজেই ডেকে পাঠিয়েছেন। ইঙ্গিতে তাঁদের পাঠিয়ে দিতে বললেন। প্রতিহার নিষ্ক্রান্ত হতেই ইউডেমাস সসম্ভ্রমে ভিতরে প্রবেশ করলেন। সঙ্গে আরও কয়েকজন। তাঁদের উপবেশন করতে ইঙ্গিত করে আলেকজান্ডার বললেন‚ “কী ব্যাপার ইউডেমাস? সিসিকোটাস সম্পর্কে নতুন কোনও খবর এখনও পর্যন্ত দেওয়া হয়নি আমাকে!”

সম্রাটের প্রশ্নে কাঁচুমাচু মুখে মাথা নাড়লেন ইউডেমাস। “ক্ষমা করবেন সম্রাট। জানাবার মতো নতুন কিছুই যে আর সংগ্রহ করা যায়নি। লোকটার একই কথা‚ অতিরিক্ত যা বলবার স্বয়ং সম্রাটকেই জানাবেন। তবে অন্যভাবে যেটুকু জানা গেছে‚ লোকটা শুধু অশ্ব-ব্যবসায়ী নয়‚ যুদ্ধ-ব্যবসায়ীও বটে। অশ্বকরাজের যথেষ্টই কাছের মানুষ।”

সেই কথায় সম্রাটের মুখ একেবারেই প্রসন্ন হল না। বিরক্তি সহকারে দুবার মাথা নাড়িয়ে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইলেন।

ঘটনার সূত্রপাত দুদিন আগে। গ্রিক সৈনিকদের এক টহলদার বাহিনী পাহাড়ের গলিঘুঁজির ভিতর অনুসন্ধানের সময় হঠাৎই লক্ষ করে‚ ভিতরে আত্মগোপন করে রয়েছে বড় এক অশ্বারোহী দল। সংখ্যায় প্রায় দুই হাজার। তৎক্ষণাৎ তাদের বন্দী করা হয়েছে। অশ্বারোহীদের দলপতিকে এরপর হাজির করা হয়েছিল গুপ্তচর-প্রধানের কাছে। প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছেন‚ তাঁর নাম শশীগুপ্ত। অশ্ব-ব্যবসায়ী। খবরটা তৎক্ষণাৎ সম্রাটকে জানানো হয়েছিল। কারণ একের পর এক যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার কারণে গ্রিক বাহিনীতে তখন অশ্বের খুবই প্রয়োজন। এই লোকটাকে দিয়ে তা সহজেই মেটানো সম্ভব। কিন্তু গুপ্তচর-প্রধানের সেই প্রস্তাবে সম্রাট একটুও খুশি হতে পারেননি। বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছেন‚ “ইউডেমাস‚ তোমার মাথায় ছাতা পড়েছে দেখছি! ইতিমধ্যেই খবর এসেছে কাশ্মীরের অভিসাররাজ অশ্বকদের সাহায্যের জন্য প্রচুর সংখ্যক সৈন্য পাঠিয়েছেন। শুধু তাই নয়‚ অশ্বকরাজ ভাড়াটে সৈন্যও সংগ্রহের চেষ্টায় রয়েছে। এরা তাদেরও কেউ হতে পারে। ভালো করে খোঁজ নাও।”

সম্রাটের এই নির্দেশ দুদিন আগের। আজ ইউডেমাসের কথায় বুঝলেন‚ এর মধ্যে অগ্রগতি বিশেষ কিছুই হয়নি। খানিক গুম হয়ে থেকে বললেন‚ “তাহলে ছোকরাকে নিয়ে এসো এখানে।”

একটু পরেই শৃঙ্খলিত শশীগুপ্তকে নিয়ে আসা হল সম্রাটের সামনে। কম্বোজবাসীর গায়ের রং পীত হলেও উপস্থিত মানুষটি ঈষৎ কৃষ্ণবর্ণ। বৃষের মতো বলিষ্ঠ শরীর। গণ্ডদেশে যত্নলালিত শ্মশ্রু। বক্ষে লৌহজালিক ব্যবহারের একাধিক চিহ্ন। তীক্ষ্ণ দুই চোখে খরদৃষ্টি। মানুষটির দিকে সামান্য দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে আলেকজান্ডার বললেন‚ “সিসিকোটাস‚ আমাদের সন্দেহ‚ তুমি অশ্বকরাজের বাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছিলে।”

এখানে বলে রাখি‚ ‘সিসিকোটাস’ শশীগুপ্ত নামের গ্রিক উচ্চারণ। গ্রিক ঐতিহাসিকেরা শশীগুপ্তকে ওই নামেই উল্লেখ করে গেছেন। সম্রাটের কথায় শৃঙ্খলিত মানুষটি বললেন‚ “একদম তাই সম্রাট। আমি যুদ্ধ-ব্যবসায়ী। তাই এতে অন্যায় কিছু নেই। আপনার সৈন্যরাই বরং অন্যায়ভাবে আমাকে বন্দী করেছে। আমি মহানুভব সম্রাটের কাছে বিচার চাইছি।” এমন স্পষ্ট উত্তর আলেকজান্ডার একেবারেই আশা করেননি। সামান্য ইতস্তত করে বললেন‚ “কিন্তু তুমি আমার শত্রু-শিবিরে যোগ দিতে যাচ্ছিলে।”

“মহানুভব সম্রাট।” বন্দী অল্প হাসলেন। “আপনি ভিনদেশি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ইতিহাস আপনার জানা থাকলে নিশ্চয়ই এই কথা বলতেন না। মদ্রদেশের (উত্তর–পশ্চিম পাঞ্জাব) রাজা শল্য‚ যিনি সম্পর্কে পাণ্ডবদের মাতুল‚ যুদ্ধে পাণ্ডব-শিবিরে যোগ দিতে এসেও পরে মত বদল করে কৌরবপক্ষে চলে গিয়েছিলেন। পাণ্ডবরা সেজন্য তাঁকে অসম্মান করেননি। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে তাঁকে কখনও শত্রু বলেও মনে করেননি। আমাদের এই দেশে এটাই বিধান।”

বন্দীর সেই কথায় আলেকজান্ডারের ভ্রুকুটিমিশ্রিত চোখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু যথাসম্ভব দমন করে গম্ভীর গলায় বললেন‚ “কিন্তু প্রবঞ্চক ব্যক্তি কি সম্মানের যোগ্য?”

“মহানুভব সম্রাট‚ জানি না আপনি কেন এই কথা বলছেন। আমি কিন্তু প্রবঞ্চনা করিনি।”

“বলোনি তুমি অশ্ব-ব্যবসায়ী?”

“বলেছি।” দৃঢ় কণ্ঠে শশীগুপ্ত বললেন‚ “কারণ আমি অশ্ব-ব্যবসায়ীও বটে। কম্বোজ দেশে এসেছিলাম উন্নতমানের অশ্বের খোঁজে। তারপর প্রয়োজনের কারণে যুদ্ধ-ব্যবসাও শুরু করতে হয়েছে।”

শশীগুপ্ত থামলেন। আলেকজান্ডার উপস্থিত প্রহরীদের আদেশ দিলেন‚ বন্দীকে মুক্ত করে যথাযোগ্য সম্মান প্রদান করতে। আদেশ পালিত হতে বিলম্ব হল না। তৎক্ষণাৎ শৃঙ্খল মুক্ত করে শশীগুপ্তর অঙ্গে দেওয়া হল মূল্যবান উত্তরীয়। পায়ে পাদুকা। মেঝেয় পাতা পারসিক গালিচায় সুদৃশ্য আসন পেতে বসতে দেওয়া হল তাঁকে। সামনে স্বর্ণথালিতে নিবেদন করা হল আঙুর আর আখরোট। বন্দী হবার পর এ যাবৎ গ্রিক শিবিরে তিনি কোনও খাদ্যই গ্রহণ করেননি। যথেষ্ট ক্ষুধার্ত হলেও সযত্নে থালি থেকে একটি মাত্র আঙুর মুখে দিয়ে বললেন‚ “মহানুভব সম্রাটের আতিথ্য গ্রহণ করলাম আমি।”

আলেকজান্ডার বললেন‚ “অতিথি‚ আমার অনুরোধ‚ অশ্বক নয়‚ যুদ্ধে তুমি গ্রিক শিবিরে যোগদান করো। সৈন্য ছাড়াও‚ এই মুহূর্তে আমাদের অশ্বেরও প্রয়োজন।”

“মহানুভব সম্রাট।” আলেকজান্ডার থামতে শশীগুপ্ত বললেন‚ “আপনার আতিথ্য যখন গ্রহণ করেছি‚ অদেয় কিছুই নেই।” আলেকজান্ডার এবার পাশে দুই সেনাপতি নিয়ারকাস আর ইউডেমাসের দিকে চোখ ফিরিয়ে নিম্নস্বরে কিছু আলোচনা সেরে নিয়ে বললেন‚ “সিসিকোটাস‚ আমার সেনাপতিদের ইচ্ছে‚ আগামীকাল মশকাবতী নগর আক্রমণে তুমি নেতৃত্ব দাও।”

উত্তরে শশীপুপ্ত বললেন‚ “আপনার সেনাপতিবৃন্দ দেখছি যথেষ্টই বিচক্ষণ। মশকাবতী নগর-প্রাচীরের অনেক বৃত্তান্তই আমার সৈন্যদের নখদর্পণে। তারা সহজেই পারবে কাজটা। চিন্তা করবেন না। তবে গ্রিক বাহিনীতে যোগ দিলেও একটি নিবেদন আছে আমার।”

“কী?” ভ্রুকুটি নেত্রে সম্রাট তাকালেন।

“এমন কিছু নয় সম্রাট। আমরা ভারতীয়। যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়মবিরুদ্ধ কাজ ঘৃণা করি। বরং পরাজয়ও আমাদের কাছে গৌরবের।”

শশীগুপ্তের সেই কথায় আলেকজান্ডারের ভ্রুকুটি নেত্র ততক্ষণে সহজ হয়ে উঠেছে। ভারতীয় যোদ্ধাদের এই অদ্ভুত আচরণ তিনি ইতিমধ্যে ভালোই লক্ষ করেছেন। তাতে বহুক্ষেত্রে সুবিধাই হয়েছে গ্রিক বাহিনীর। অল্প হাত তুলে অনুমোদন জানাতে দ্বিধা করলেন না।

কম্বোজের গ্রিক রণশিবিরে সেদিনের ঘটনা ভারতের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। গ্রিক শিবিরের কেউই অবশ্য সেদিন তার কিছুমাত্র অনুমান করতে পারেনি। স্বয়ং আলেকজান্ডারও নন। পরের দিন তারা রণক্ষেত্রে নিজের চোখেই দেখেছিলেন শশীগুপ্ত আর তার বাহিনীর পরাক্রম। নগরের যে তোরণদ্বার বহু চেষ্টা করেও গ্রিক বাহিনী ভেদ করতে পারেনি‚ সেই তোরণদ্বারের যাবতীয় প্রতিরোধ শশীগুপ্তের বাহিনী সহজেই ভেঙে ফেলতে পেরেছিল। নগর রক্ষায় এরপর অস্ত্র হাতে এগিয়ে এসেছিল মেয়েরাও। কিন্তু ততক্ষণে উন্মুক্ত দ্বারপথে অশ্বারোহী গ্রিক বাহিনী স্রোতের মতো প্রবেশ করতে শুরু করেছে। ক্ষুব্ধ আলেকজান্ডারের নির্দেশে সেদিন মশকাবতী নগরে চলেছিল নির্বিচার হত্যালীলা। মৃত্যু হয়েছিল সাত হাজার কম্বোজবাসীর। যাদের অনেকেই ছিলেন সাধারণ মানুষ। আলেকজান্ডারের জীবনকাহিনিতে বড় একটা কালো দাগ তিনি নিজেই এঁকে দিয়েছিলেন সেদিন।

গ্রিক বাহিনীতে শশীপুপ্তের প্রতিপত্তি যে এরপর অনেক বেড়ে গিয়েছিল‚ তা বলাই বাহুল্য। আলেকজান্ডার অবশ্য তাঁর সেনাপতিদের গোপনে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন‚ শশীগুপ্ত আর তার বাহিনীর উপর যেন কড়া নজর রাখা হয়।

গোড়ার দিকে সেই নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করা হলেও পরের দিকে অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়েছিল। কারণ ততদিনে শশীগুপ্ত আর তার বাহিনী গ্রিক সেনাদের খুব কাছের মানুষ হয়ে পড়েছিল। শশীগুপ্তের ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন গ্রিক ঐতিহাসিকেরাও। এ্যারিয়ান আর কার্টিয়াসের মতো ঐতিহাসিকও তাঁদের লেখায় একাধিকবার তাঁর উল্লেখ করে গেছেন। কিন্তু পুরুর সঙ্গে লড়াইয়ের পরেই শশীগুপ্তের আর কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না।

পাওয়ার কথাও নয়। ঘটনা হল‚ সেদিন ঝিলমের তীরে সেই ভয়ানক যুদ্ধশেষে পুরু যখন বন্দী হলেন, তারপর শশীগুপ্ত বা তার বাহিনীর কোনও হদিশ আর পাওয়া যায়নি। আলেকজান্ডার তাঁর গুপ্তচর বাহিনীর সাহায্যে যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। তার আরও একটা কারণ‚ ভারতে প্রবেশের অতি অল্পদিনের মধ্যেই সুশৃঙ্খল গ্রিক বাহিনী আর আগের মতো ছিল না। ভালো রকম ঘুণ ধরে গিয়েছিল। আলেকজান্ডার নিজেও বুঝতে পারছিলেন‚ তাঁর বাহিনী আর সেই আগের মতো সুশৃঙ্খল নেই। অল্পদিন আগেও যে বাহিনী প্রবল উৎসাহে ভারত অভিযানের স্বপ্ন-বিভোর হয়েছিল‚ তারা হঠাৎই দেশে ফিরে যেতে চাইছে। আর অগ্রসর হতে রাজি নয়। এমনকী পদস্থ সেনাধ্যক্ষদের মনোভাবও ব্যতিক্রম নয়।

 

আমাদের এই কাহিনির দ্বিতীয় অঙ্কের যবনিকা উন্মোচন আরও প্রায় দেড় বছর পরে। আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষ জয়ের আশা ত্যাগ করে সম্রাট আলেকজান্ডার তখন ফেরার পথে। বহু চেষ্টা করেও গ্রিক বাহিনীর মনোভাব তিনি পরিবর্তন করতে পারেননি। অগত্যা সেনাবাহিনীর ইচ্ছা মেনে নিয়ে নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফেরার পথ ধরেছেন। আগেই বলেছি‚ ফেরবার সময় তিনি আর পুরোনো পথে যাননি। গিয়েছিলেন জলপথে। সমস্যা তাতেও কম হয়নি। মূল বাহিনীকে তিনি দুই ভাগ করে নিয়েছিলেন। একভাগ নদীপথে সিন্ধু নদের মোহনার দিকে। অন্যভাগ নদীর দুই পাশে অশ্ব-পৃষ্ঠে আর পদব্রজে। ব্যবস্থা সামরিক দিক দিয়ে ছিল নিখুঁত। কিন্তু তবু ঝিলম আর চীনাবের সঙ্গম অঞ্চলে পৌঁছে তিনি খবর পেলেন‚ মালব‚ ক্ষুদ্রক এবং অর্জুনায়ন রাজ্যের এক যৌথ বাহিনী গোপনে তাঁকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। শুধু তাই নয়‚ চেষ্টা চলছে‚ শিবি রাজ্যকে সেই বাহিনীতে সামিল করার।

নিশ্চিত সংবাদটা কানে আসতে আর দেরি করেনি তিনি। দিগ্‌বিজয়ী সম্রাট জানতেন‚ শত্রু সংগঠিত হবার আগেই তাকে ধ্বংস করে দিতে হয়। অন্যথা হলেই বিপদ। খবর ছিল‚ দূরে নদী আর পাহাড়বেষ্টিত অরণ্যময় এক স্থানে তিন রাজ্যের সৈন্য বাহিনীর জমায়েত শুরু হয়েছে। অকুস্থল অনেকটাই দূরে। আলেকজান্ডার বাছাই একদল অশ্বারোহী নিয়ে রাতেই রওনা হয়ে পড়েছিলেন‚ যাতে খুব ভোরে অকুস্থলে পৌঁছে যাওয়া যায়। সেনাধ্যক্ষ নিয়ারকাসের নেতৃত্বে মূল বাহিনী ছিল পিছনে।

হিসেবে ভুল ছিল না। দুরন্ত বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে সেই বাহিনী যখন অকুস্থলে পৌঁছল‚ সবে ভোর হয়েছে। শিবিরের অধিকাংশই তখন নিদ্রামগ্ন। প্রহরী যারা ছিল‚ অন্যদের সতর্ক করার আগেই স্বয়ং আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে গ্রিক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের উপর। অপ্রস্তুত প্রতিপক্ষ এমন ঝটিকা আক্রমণ খুব বেশিক্ষণ সামাল দিতে পারেনি। আত্মসমর্পণ করল অতি অল্প সময়ের মধ্যেই। কিন্তু আলেকজান্ডার এই প্রথম লক্ষ করলেন‚ খুব ছোট হলেও প্রতিপক্ষের একটা অংশ প্রস্তুত হয়ে পালটা আক্রমণ শুরু করেছে। ছুটে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে তির‚ ভল্ল। তবে তারা অশ্বারোহী সৈনিক নয়। পদাতিক। দুটি রণহস্তীও রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে আলেকজান্ডার উপস্থিত থাকলে বরাবর নিজেই নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। অন্যের উপর নির্ভর করেন কদাচিৎ। গাউগামেলার যুদ্ধে পারসিক রথী এবং অশ্বারোহীর সেনা যখন গ্রিক বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে অনেকটাই ভিতরে ঢুকে পড়েছে‚ তাদের পাশ কাটিয়ে আলেকজান্ডার তাঁর রাজকীয় অশ্বারোহী সেনা নিয়ে যাবতীয় বাধা নির্মূল করে পৌঁছে গিয়েছিলেন পারস্য সেনাবাহিনীর কেন্দ্রস্থল সম্রাট দরায়ুসের অতি নিকটে। আকস্মিক সেই ঘটনায় ভীতচকিত পারস্য সম্রাট অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই নিজের প্রাণ বাঁচাতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেছিলেন। দুঃসাহসী আলেকজান্ডারের সুনিপুণ যুদ্ধ পরিকল্পনা সেই মুহূর্তে গ্রিক বাহিনীর জয় নিশ্চিন্ত করে ফেলেছিল।

ব্যতিক্রম হল না আজও। একদল অশ্বারোহী নিয়ে সম্রাট ছুটে গেলেন সেই পদাতিক সৈন্যদের দিকে। ভয়ানক ব্যাপারটা ঘটে গেল ওই সময়। অল্প কিছু দূর অগ্রসর হতেই অকস্মাৎ বিশাল আকৃতির এক ভল্ল ছুটে এল সম্রাটের দিকে। তীব্রবেগে আঘাত করল তাঁর পাঁজরে। মুহূর্তে পড়ে গেলেন অশ্বপৃষ্ঠ থেকে। ততক্ষণে দেহরক্ষীরা ছুটে এসেছে। তাদের সাহায্যে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। দীর্ঘ ভল্ল সম্রাটের লৌহজালিকে বাধাপ্রাপ্ত হলেও তীক্ষ্ণ অগ্রভাগের সামান্য অংশ বিদ্ধ হয়েছে। ক্ষতস্থানে রক্তের ধারা। সম্রাট ফের অশ্বে আরোহণ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দেহরক্ষীদের প্রধান বাধা দিয়ে বলল‚ “ক্ষান্ত হন সম্রাট। প্রতিপক্ষের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। প্রাণভয়ে পালাচ্ছে। পিছনে যে মূল বাহিনী আসছে‚ তারা সহজেই অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে পারবে।”

যুদ্ধক্ষেত্রে আলেকজান্ডার সাধারণত এসবে কর্ণপাত করেন না। কিন্তু আজ করলেন। এই কয়েক মাসে ভারতীয়দের যুদ্ধ প্রণালীর অনেক কিছুই তাঁর নখদর্পণে। বেশ জানেন‚ যে ভল্ল তাঁকে আঘাত করেছে‚ তা কোনও মানুষের ছোঁড়া নয়। ছোঁড়া হয়েছে রণহস্তীর সাহায্যে। বিশেষ ধরনের অভেদ্য লৌহজালিক ব্যবহার করেন বলেই রক্ষা পেয়ে গেছেন। এ দেশের যুদ্ধক্ষেত্রে এ এক অত্যাশ্চর্য অস্ত্র! বিশাল আকারের যে ধনুক থেকে এই ভল্ল নিক্ষেপ করা হয়‚ মানুষের সাধ্য নয়‚ তাতে শর-সংযোগ করা। একজোড়া রণহস্তীর পিছনে জুড়ে দেওয়া হয় সেই ধনুক। পিটিয়ে মাটিতে পুঁতে দেওয়া মোটা এক গোঁজে পরানো থাকে ধনুকের ছিলা। ইঙ্গিতে দুই রণহস্তী কয়েক পা এগিয়ে গেলেই ছিলায় টান পড়ে। তখন সেই ছিলায় ভল্ল যোজনা করে কৌশলে মাটিতে পোঁতা গোঁজ সরিয়ে নেওয়া হয়। অভিজ্ঞ তিরন্দাজ হলে নিপুণ লক্ষ্যে সেই ভল্ল বহুদূরের লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাধ্যক্ষ‚ সেনানায়কদের আঘাত করতেই ব্যবহার হয় এই অস্ত্র। মশকাবতী অবরোধের সময় এই অস্ত্রে তাঁর কয়েকজন সেনানায়কের মৃত্যু হয়েছে।

যেমন দ্রুত গ্রিক বাহিনী হাজির হয়েছিল‚ তেমন দ্রুতই তারা আহত সম্রাটকে নিয়ে শিবিরের দিকে ফিরে গেল। তাতে অবশ্য শত্রু শিবিরের কোনও সুবিধা হয়নি। আহত সম্রাটকে নিয়ে গ্রিক বাহিনীকে ফিরে যেতে দেখেও মালব‚ ক্ষুদ্রক এবং অর্জুনায়নের মিলিত বাহিনীর ভিতর নতুন কোনও উদ্দীপনা নয়‚ বরং কিছু বিশৃঙ্খলাই লক্ষ করা যাচ্ছিল। তার উপর অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়ারকাস তার বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের উপর। সেই আক্রমণে তিন রাজ্যের মিলিত বাহিনী সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল দুপুরের মধ্যেই। সংবাদ পেয়ে শিবি রাজার বাহিনীও আর অগ্রসর না হয়ে ইতিমধ্যে ফিরে গেছে। কিন্তু অন্য এক ঘটনায় গ্রিক শিবিরে তখন প্রায় তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে।

ফেরার পথেই আলেকজান্ডার টের পাচ্ছিলেন‚ শরীরটা মোটেই ভালো মনে হচ্ছে না। দ্রুত শিবিরে পৌঁছোবার জন্য তাগাদা দিচ্ছিলেন। অশ্বারোহী বাহিনীও যথাসম্ভব দ্রুতই পৌঁছে গিয়েছিল শিবিরে। কিন্তু ততক্ষণে সম্রাট আর কথা বলার অবস্থায় নেই। প্রায় নিঃসাড় হয়ে গেছে শরীর। নাড়ির গতি ক্ষীণ। শিবিরের প্রধান কয়েকজন চিকিৎসক ছুটে এসেছেন তৎক্ষণাৎ। যথাসাধ্য করে চলেছেন তাঁরা। ক্ষতস্থানে বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে। তাতে সম্রাটের নাড়ির গতি সামান্য বেড়েছে‚ এই মাত্র। অন্য কোনও উন্নতি হয়নি।

থমথম করছে গ্রিক শিবির। এ যাবৎ যুদ্ধ কম করেননি আলেকজান্ডার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেই উপস্থিত থেকেছেন‚ সৈন্য পরিচালনা করেছেন। এমন অঘটন কখনও হয়নি। চিকিৎসক জানিয়ে দিয়েছেন‚ সম্রাটের যা অবস্থা‚ রাতের মধ্যে যদি উন্নতি না হয়‚ বাঁচানো মুশকিল। ধীর ক্রিয়াসম্পন্ন তীব্র বিষ মেশানো ছিল ভল্লের ফলায়। বিষের স্বরূপ জানা গেলে হয়তো কিছু সুবিধা হত। চিকিৎসকরা তাই কিছুই ভরসা দিতে পারছেন না। এই অবস্থায় দুই সেনাধ্যক্ষ ইউডেমাস আর পাইথন একান্তে আলোচনায় বসে সিদ্ধান্ত নিলেন‚ অনতিবিলম্বে সম্রাটের চিকিৎসায় কোনও ভারতীয় বৈদ্যকে ডাকা হবে।

তখন সন্ধ্যা প্রায় উত্তীর্ণ। বৈদ্যের সন্ধানে রওনা হবার তোড়জোড় চলছে। হঠাৎ প্রতিহার দুই সেনাধ্যক্ষের বস্ত্রাবাসে এসে জানাল‚ গ্রিক শিবিরের প্রধান-দ্বারদেশে দুই আগন্তুক দাঁড়িয়ে আছে। একজন মজবুত চেহারার যুবক। বয়স তিরিশের কাছে। অন্যজন বৃদ্ধ। যুবক জানাচ্ছেন‚ তিনি সম্রাটের চিকিৎসার জন্য বৈদ্য নিয়ে এসেছেন।

সব শুনে দুই সেনাধ্যক্ষ পরস্পর মুখের দিকে তাকালেন। একটু পরে পাইথন বললেন‚ “নষ্ট করার মতো সময় আর হাতে নেই। তবে…”

তাঁর কথা শেষ হল না‚ গুপ্তচর সচিব প্রবেশ করলেন। ইউডেমাস তাঁকে খবর সংগ্রহে পাঠিয়েছিলেন। প্রশ্ন করতেই তিনি বললেন‚ “দুই আগন্তুককেই ছত্রভঙ্গ শত্রু শিবিরের দিক থেকে আসতে দেখা গেছে।”

দুই সেনাধ্যক্ষ তখন ফের পরস্পর মুখের দিকে তাকিয়ে। সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ কাজ নয়। তবু ইউডেমাসই প্রথম মুখ খুললেন‚ “যাই হোক‚ আর সময় নষ্ট করা যায় না। ডাকো ওদের।”

একটু পরেই নিয়ে আসা হল দুই আগন্তুককে। যুবা পুরুষটির দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে উঠল দুই সেনাধ্যক্ষরই। মজবুত দেহের পুরুষটি যে একজন যোদ্ধা‚ কোনও সন্দেহ নেই। দেহের কয়েক স্থানে সদ্য রক্তক্ষরণের দাগ। বক্ষে লৌহজালিক ব্যবহারের চিহ্ন। মুখমণ্ডলে আভিজাত্যের ছাপ। সেদিকে এক পলক তাকিয়ে ইউডেমাস ঢোঁক গিলে বললেন‚ “আগন্তুক‚ তুমি আজ সকালে যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলে। কী উদ্দেশ্যে এখানে এসেছ?”

“সেনাধ্যক্ষ‚ আপনার অনুমান একদম সঠিক।” নির্লিপ্ত কণ্ঠে যুবা-পুরুষ বললেন‚ “সকালে যুদ্ধক্ষেত্রেই ছিলাম আমি। এও জানিয়ে রাখি‚ সম্রাটকে লক্ষ্য করে আমিই ভল্ল নিক্ষেপ করেছিলাম। তখন জানতাম না‚ ভল্লের ফলায় বিষ মাখানো আছে। পরে খবরটা জানতে পেরেই উপযুক্ত বৈদ্যকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে এসেছি। অনুগ্রহ করে অযথা সময় নষ্ট করবেন না। দেরি হলে সম্রাটকে আর বাঁচানো সম্ভব হবে না।”

এই কথার পরে দুই সেনাধ্যক্ষ আর দেরি করেননি। শুধু জানিয়ে দিয়েছিলেন‚ সম্রাট সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত দুজনকে শিবিরে বন্দী করে রাখা হবে।

এরপর অনতিবিলম্বে বৈদ্যকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অসুস্থ সম্রাটের বস্ত্রাবাসে। তিনি সেই মুহূর্তেই চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। সঙ্গের বটুয়া থেকে কয়েক প্রস্থ জড়িবুটি বের করে শিলে পিষে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ক্ষতস্থানে। সম্রাটের অসাড় দেহের অন্য কয়েকটি ক্ষতস্থানেও লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই ওষুধ।

ওষুধে কাজ হয়েছিল প্রায় মন্ত্রের মতো। ভোর হবার আগে সম্রাট নিজেই উঠে বসেছিলেন শয্যার উপর। তারপর স্মরণশক্তি ফিরে আসতেই তাঁর প্রথম কথা‚ “কী ব্যাপার? আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নাকি! যুদ্ধের কী সংবাদ?”

সেনাধ্যক্ষরা সম্রাটের শয্যার পাশেই উপস্থিত ছিলেন। ইউডেমাস বললেন‚ “উদ্বিগ্ন হবেন না সম্রাট। সব ঠিক আছে। আপনার এখন সামান্য বিশ্রাম দরকার।”

কিন্তু অন্য ধাতুতে গড়া সম্রাট ততক্ষণে স্বমূর্তিতে ফিরে এসেছেন। মাথার একরাশ চুল ঝাঁকিয়ে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললেন‚ “মনে রেখো‚ সম্রাট আলেকজান্ডার বিশ্বজয় করতে বেরিয়েছে। বিশ্রাম করতে নয়। আমি এখনই সব জানতে চাই।”

অগত্যা ধীরে ধীরে সব কথাই খুলে বলা হল তাঁকে। নিঃশব্দে সব শুনলেন তিনি। তারপর বললেন‚ “কোথায় সেই যুবক? নিয়ে এসো।”

নির্দেশ পালনে বিলম্ব হল না। আলেকজান্ডার যুবকের দিকে এক পলক তাকালেন মাত্র। তারপরেই উপস্থিত দোভাষীকে উদ্দেশ্য করে বললেন‚ “কী নাম জিজ্ঞাসা করো।”

দোভাষী কথা বলার আগেই সেই যুবক পরিষ্কার গ্রিক ভাষায় বললেন‚ “মহানুভব সম্রাট‚ আমি চন্দ্রগুপ্ত। মগধ দেশের মানুষ।”

আলেকজান্ডার ফের একবার তাকালেন আগন্তুকের দিকে। তারপর উপস্থিত অন্যদের নির্দেশ দিলেন ঘর থেকে বের হয়ে যাবার জন্য। আগন্তুক যুবকের সঙ্গে তিনি একান্তে কথা বলতে চান।

সম্রাটের আদেশ পালিত হতে বিলম্ব হল না। বস্ত্রাবাসের দ্বার বন্ধ হতেই তিনি বললেন‚ “কী নাম বললে? স্যান্ড্রোকোটাস?”

এখানে বলা দরকার‚ ‘স্যান্ড্রোকোটাস’ চন্দ্রগুপ্তের গ্রিক উচ্চারণ। গ্রিক ঐতিহাসিকেরা তাঁকে ওই নামেই উল্লেখ করেছেন। যাই হোক‚ সম্রাটের প্রশ্নের উত্তরে যুবক বললেন‚ “হ্যাঁ মহানুভব সম্রাট। আমি চন্দ্র…”

“না।” কথার মাঝেই আলেকজান্ডার বলে উঠলেন‚ “তুমি সিসিকোটাস। দেড় বছর আগে আমার রণশিবিরের বস্ত্রাবাসে ওই নামেই নিজের পরিচয় দিয়েছিলে। তখন অবশ্য তোমার গালে চমৎকার দাড়ি ছিল। নিপাট করে কামিয়ে ফেলেছ এই মাত্র। তবে সেজন্য আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারোনি। দেখেই চিনেছি। সেদিন তোমাকে প্রবঞ্চক বলেছিলাম। কিছুমাত্র ভুল করিনি।”

“না‚ মহানুভব সম্রাট। আমি প্রবঞ্চক নই।”

“তাহলে বলতে চাও তুমি সেদিনের সেই সিসিকোটাস নও?”

“হ্যাঁ‚ মহানুভব সম্রাট। আমি সেই শশীগুপ্ত। কিন্তু আপনার জানা নেই‚ চন্দ্র অর্থাৎ চাঁদের আর এক নাম শশী। তাই দুটি নামের একই অর্থ। মগধের এক রাজপরিবারে জন্ম হলেও শৈশবেই পিতৃহারা। রাজ্যহারাও। মগধরাজের নিযুক্ত গুপ্তঘাতক তখন হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে আমাকে। বাধ্য হয়েই ওই নাম নিতে হয়েছিল। তক্ষশীলায় এসেছিলাম অস্ত্রশিক্ষার জন্য। শিক্ষা শেষ হতে বুঝলাম পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার করতে হলে শুধু অস্ত্রশিক্ষাই যথেষ্ট নয়। অর্থেরও প্রয়োজন। তাই অশ্ব-ব্যবসায়ের কাজে কম্বোজ রাজ্যে গিয়েছিলাম। কম্বোজের অশ্বের খ্যাতি সারা ভারতবর্ষে। আপনি মানবেন নিশ্চয়ই।”

“তা ঠিক।” আলেকজান্ডার অল্প হাসলেন। “গ্রিক বাহিনীতে যে অশ্ব তুমি সরবরাহ করেছ, তা যথেষ্টই উন্নত মানের। কিন্তু সেই সঙ্গে অতি সঙ্গোপনে গ্রিক বাহিনীর চরম সর্বনাশও করেছো। তারপর গা ঢাকা দিয়েছ আমি বুঝে ওঠার আগেই।”

“তা করেছি সম্রাট। শুধু সাধারণ গ্রিক সৈন্য নয়‚ একটু একটু করে আপনার সেনাধ্যক্ষদের মনেও মগধ সম্রাট উগ্রসেন (নন্দরাজা) সম্পর্কে এক কাল্পনিক ভীতি ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলাম। আমার সৈন্যরাও কাজটা করেছে অতি চমৎকারভাবে।” অল্প থেমে যুবক বললেন‚ “কিন্তু এ তো রাজনীতিরই অঙ্গ। কারণ ইতিমধ্যে আমি যে শুধু পিতার রাজ্য নয়‚ মগধ সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। তাই যোগ দিতে হয়েছিল গ্রিক সেনাবাহিনীতে। উদ্দেশ্য‚ অপরাজেয় গ্রিক সম্রাটের রণকৌশল অবলোকন। সেজন্য সামান্য কৌশল করতেই হয়েছিল। নইলে সেদিন গ্রিক টহলদার বাহিনীর সাধ্য ছিল না আমাকে বন্দী করে।”

“তা কী শিখলে?” আলেকজান্ডার প্রশ্ন করলেন।

“শিখলাম অনেক কিছু।” অল্প থেমে যুবক বললেন‚ “কিন্তু তার সবকিছু আমাদের ভারতবাসীর পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাই যেদিন রাতের অন্ধকারে গ্রিক সেনা ঝিলম পার হয়ে পুরুর বাহিনীকে পিছন থেকে আক্রমণ করল‚ যুদ্ধক্ষেত্রে সেই অন্যায় আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ভোর হবার আগেই গ্রিক বাহিনীর সঙ্গ ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। ওই একই কারণে গতকাল ছুটে আসতে হয়েছে এই শত্রু শিবিরে। মহানুভব সম্রাট‚ আপনার সেনাধ্যক্ষ আমাকে বন্দী করে রেখেছে। ওরা অবশ্য জানে না‚ বিশ্বজয়ী গ্রিক সম্রাটের কত বড় ক্ষতি আমার হাতে হয়েছে। তাই শাস্তি দিতেই পারেন।”

তেল কমে আসায় বস্ত্রাবাসের বাতিগুলো তখন দপদপ করতে শুরু করলেও বাইরে দিনের আলোর কিছু অংশ ভিতরে এসে পড়ায় সম্রাটের কক্ষ তখন আরও উজ্জ্বল। কয়েক মুহূর্ত কারও মুখেই কথা নেই। শেষে নীরবতা ভেঙে আলেকজান্ডার বললেন‚ “স্যান্ড্রোকোটাস‚ রাজনীতির সাফাই দিলেও তুমি শাস্তি এড়াতে পারো না। তবু সাধ অপূর্ণ রেখে ফিরে যেতে হলেও তোমাকে শাস্তি দেব‚ এমন সামর্থ্য আমার নেই।”

“এ কী বলছেন সম্রাট!” একরাশ বিস্ময় ঝরে পড়ল চন্দ্রগুপ্তের গলায়।

“পোরসের (পুরু) মতো সামান্য এক পরাজিত রাজা আমার কাছে রাজার মতো ব্যবহার আশা করেছিল। সম্রাট আলেকজান্ডার তাঁর সেই ইচ্ছের যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে দ্বিধা করেনি। আর এদেশের এক ভাবী সম্রাটের সঙ্গে তিনি অন্য ব্যবহার করবেন‚ নিশ্চয়ই আশা করতে পারো না।” বলতে বলতে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন তিনি। দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন চন্দ্রগুপ্তকে।

 

ছবিঃ সপ্তর্ষি দে

To Top