সৈকত মুখোপাধ্যায় টমটম চলছে

 

এক

বলব না বলব না করেও ঋককে একদিন আমার টমটমের গল্পটা বলেই ফেলেছিলাম।
অন্য একটা কোম্পানির চাকরি ছেড়ে তখন সবে দুর্গাপুর স্টিল-প্ল্যান্টে আরও একটু উঁচু পোস্টে জয়েন করেছি।

জি.টি. রোডের যেদিকে স্টিল-প্ল্যান্ট, তার ঠিক উলটোদিকে বিশাল জায়গা জুড়ে স্টিল-প্ল্যান্টের টাউনশিপ। সেই টাউনশিপের সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় যে কোয়ার্টারগুলো, সেগুলো আমাদের মতন উঁচুতলার স্টাফদের জন্যে বরাদ্দ। ঝকঝকে রাস্তার দুপাশে ছবির মতন বাংলো-প্যাটার্নের সারি সারি কোয়ার্টার। প্রতিটি বাংলোকে ঘিরে বাগান।
কোনও না কোনও বৈজ্ঞানিকের নামে এখানকার রাস্তাগুলোর নাম। ভাবা রোড, এডিসন রোড, নিউটন রোড, আর্যভট্ট সরণী এইরকম। আমি কোয়ার্টার পেলাম ভাবা রোডে।
প্রথমদিন ঘুম ভাঙার পর জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম এক অপূর্ব দৃশ্য। ভাবা রোড হচ্ছে টাউনশিপের একেবারে শেষ প্রান্তের একটা রাস্তা। তারপরেই শুরু হচ্ছে উঁচু-নিচু ডাঙা জমি। তার শেষ দেখা যায় না। সেই রুক্ষ্ম জমির মধ্যে দিয়ে একটা সবুজ গাছে ছাওয়া পথ এঁকেবেঁকে কোথায় চলে গেছে কে জানে। আমার সহকারী সুকুমারকে জিগ্যেস করতে ও বলল, “ওই রাস্তাটার নাম নাচন রোড। ওটার শেষে নাচন নামে একটা গ্রাম আছে।”
তখনই ঠিক করে ফেললাম, নাচন যেতেই হবে। আর যাব আমার টমটমে চেপে। টমটম আমার সাইকেলের নাম। ওই বাবলাগাছে ছাওয়া লালমাটির রাস্তা ধরে মাইলের পর মাইল সাইকেল চালানোর মজাই আলাদা।
পরের দিনই আমার উত্তরপাড়ার বাড়ি থেকে রেলের পার্সেল-ভ্যানে চাপিয়ে টমটমকে দুর্গাপুরে নিয়ে চলে এলাম। আর তার পরের রবিবারেই একদম ভোরবেলায় রওনা হয়ে ঘুরে এলাম নাচন। কেউ যদি জিগ্যেস করত, “কেন গেলে? কী দেখলে?” উত্তর দিতে পারতাম না। কাউকে কি বলা যায়, কুলগাছের ডালে একটা মস্ত বড় মাকড়শার জাল দেখলাম, যেটার গায়ে হিরের কুচির মতন একহাজারটা শিশিরের ফোঁটা দুলছিল? কাউকে কি বলা যায়, একটা বাজপড়া শিমুলগাছ দেখলাম, যেটাকে ঠিক ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতন দেখতে লাগছিল? কিংবা বলা যায়, অনেকক্ষণ একটা নির্জন ডোবার পাড়ে বসে দেখেছিলাম মা হাঁসের পেছন পেছন তার সাতটা ছানা কেমন লাইন দিয়ে সাঁতার কাটছে?
এসব বললে পাগল ভাবত না লোকে?
যাই হোক, তারপর থেকে ছুটি পেলেই আমি টমটমে চেপে কোনওদিন রনডিহায় দামোদরের ধারে, কোনওদিন কাজোরার পুরোনো কয়লাখনির বিলে, কোনওদিন তুষকুটির অজয় নদীর চরে বেড়াতে চলে যেতাম। কে বলবে ভুষোকালিমাখা ভূতের মতন দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টের আশেপাশে এমন সব ছবির মতন জায়গা রয়েছে?
আমাদের রাস্তায় প্রত্যেক কোয়ার্টারেই সাহেবসুবোদের বাস। বেশিরভাগই স্টিল-প্ল্যান্টের ইঞ্জিনিয়ার। তাছাড়া বড় পোস্টে কাজ করা অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ম্যানেজার, এঁরাও ছিলেন। বুঝতেই পারতাম, তাঁরা আমার সাইকেল চালানোটাকে ভালো চোখে দেখছেন না। অনেকেই ডেকে বলতেন, “মিস্টার মুখার্জি, এবার একটা গাড়ি কিনে নিন না।”
আমি তর্কে না গিয়ে প্যাডেল করতে করতেই জবাব দিতাম, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক বলেছেন।”
আমার বাংলোর নম্বর কুড়ির নয় ভাবা রোড আর পাশেই কুড়ির দশ ভাবা রোডে সুমিত রায়ের কোয়ার্টার। সুমিতদা আমাদের সেকশনেই কাজ করতেন। মেটালার্জিতে বিদেশের ডিগ্রি ছিল। তাই বেশ কম বয়সেই সিনিয়ার সুপারভাইজারের পোস্টে উঠে গিয়েছিলেন। মানুষটা ছিলেন ভীষণ ভালো। স্বভাবের মধ্যে কখনও অহঙ্কারের ছিটেফোঁটা দেখিনি।
আমি তখনও বিয়েটিয়ে করিনি, আমার কোয়ার্টারে একাই থাকতাম। সন্ধে হলেই জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সুমিতদা আমাকে হাঁক পেড়ে ডাকতেন। “মুখার্জী, এই মুখার্জী। শিগ্‌গির এসো।”
আমিও আমার জানলায় দাঁড়িয়ে বলতাম, “কী বলছেন?”
“তোমার বৌদি তোমাকে ডাকছে। চলে এসো।”
বৌদি মানে সুমিতদার স্ত্রী মিলা। মিলাবৌদিও সুমিতদার মতনই হাসিখুশি মিষ্টিস্বভাবের মানুষ। বুঝতেই পারতাম কেন এত ডাকাডাকি। আসলে আমি বাড়ি ফিরে প্রতিদিন পাঁউরুটি কিংবা মুড়ি চিবাব এটা ওঁরা মানতে পারতেন না। আমি সুমিতদার ড্রইংরুমে গিয়ে বসামাত্রই বৌদি একপ্লেট চিড়ের পোলাও, কিংবা পুডিং কিংবা ওইরকমই অন্য কোনও সুস্বাদু জলখাবার এনে আমার সামনে নামিয়ে দিতেন। আমি ঘোর আপত্তি জানাতাম। বলতাম, “রোজ রোজ কষ্ট করে কেন এইসব বানান বৌদি?”
বৌদি বলতেন, “তোমার একার জন্যে বানাই নাকি? আমরা খাইনা? বেশি পাকামি না করে খেয়ে নাও।”
সুমিতদা ততক্ষণে দাবার বোর্ড সাজিয়ে ফেলেছেন।
এইভাবে দুর্গাপুরে যে তিনবছর ছিলাম, তার মধ্যে বেশিরভাগ সন্ধেগুলোই আমার সুমিতদার কোয়ার্টারে কেটেছিল। এই সুমিতদা আর মিলাবৌদিরই একমাত্র ছেলে ছিল ঋক। আমি যখন ওখানে গেলাম, তখন ঋক ক্লাস এইটে পড়ত। ঋক ছিল ওর বাবা-মায়ের মতনই সুন্দর। শুধু চেহারাতেই সুন্দর নয়, ব্যবহারটাও এমন ছিল যে, যে কোনও মানুষকেই অল্প সময়ের মধ্যে আপন করে নিত। খুব সরল ছিল ছেলেটা।
সরল ছিল বলেই বোধ হয় একদিন আমাকে জিগ্যেস করে ফেলল, “কাকু, তুমি সাইকেল চালাও কেন?”
জিগ্যেস করলাম, “কেন ঋকবাবু? সাইকেল চালালে কী হয়?”
ঋকের সোজাসাপটা উত্তর – “সাইকেল তো লেবাররা চালায়।”
বুকের মধ্যে একটা জোরালো ধাক্কা খেলাম। কিন্তু ভেবে দেখলাম, ঋকের দোষ নেই। ও যা দেখেছে, তাই বলেছে।
টাউনশিপে আলাদা আলাদা লেভেলের স্টাফের জন্যে আলাদা আলাদা পাড়া। বড়সাহেবদের পাড়ায় সুন্দর সুন্দর বাংলো। ক্লার্কবাবুদের পাড়ায় ছোট ছোট ফ্ল্যাট। আর লেবারদের জন্যে একদম ঘুপচি একতলা সব বাড়ি। আমাদের ভাবা রোড, এডিসন রোড, নিউটন রোড – এসব হচ্ছে বড়সাহেবদের পাড়া। এখানে চার চাকার গাড়ি চলে। ক্লার্কবাবুদের পাড়ায় চলে স্কুটার, মোটর সাইকেল আর লেবারদের পাড়ায় সাইকেল।
ঋক জন্ম থেকে এইরকমই দেখেছে। এই প্রথম ও ওদের পাড়ায় কাউকে সাইকেল চালাতে দেখছে।
ওকে বললাম, “তুমি কি জানো যে, পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশের মানুষেরা সাইকেল চালাতে ভালোবাসে? কেন বলো তো? সাইকেল চালালে পলিউশন হয় না। পলিউশন কাকে বলে জানো তো?”
ঋক ঘাড় হেলাল।
“দুনম্বর পয়েন্ট হল, সাইকেল চালালে খুব ভালো এক্সারসাইজ হয়।”
ঋক বলল, “এক্সারসাইজ করতে চাইলে জিমে গেলেই তো পারো।”
তখনই আমি ঋককে টমটমের পুরো ইতিহাসটা বললাম।

 

দুই

“আমার বয়স যখন তোমার মতন, তখন বাবা আমাকে এই সাইকেলটা কিনে দিয়েছিলেন। আমার বাবাও কিন্তু একজন লেবার ছিলেন। তাও দুর্গাপুরের মতন এমন বড় কারখানায় নয়, উত্তরপাড়া খেয়াঘাটের রাস্তায় একটা ছোট্ট ফাউন্ড্রিতে উনি কাজ করতেন। উনি ছিলেন যাকে বলে ‘লেদ-অপারেটর’।
“গরমের ছুটিতে গঙ্গায় একঘণ্টা সাঁতার কেটে খেয়াঘাটের রাস্তা ধরে যখন বাড়ি ফিরতাম, তখন বাবার কারখানার পাশ দিয়েই ফিরতে হত। কালিঝুলি মাখা ভাঙা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেতাম বাবা একটা মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে একমনে কাজ করছেন। সেই মেশিনটার মাথার কাছে একটা শানপাথরের মতন চাকা প্রচণ্ড জোরে বাঁইবাঁই করে ঘুরছে আর বাবা একটার পর একটা সরু শিকের মতন জিনিস ওই চাকাটার গায়ে চেপে ধরে সেগুলোকে ধারালো করে তুলছেন।
“ঘুরন্ত শানপাথরের গায়ে লোহার শিকগুলো ছোঁয়ানোমাত্র তুবড়ির মতন আগুনের ফুলকি বেরিয়ে আসত। আমি এমন মুগ্ধ হয়ে সেই দৃশ্য দেখতাম যে, বাড়ি ফেরার কথা মনেই থাকত না। স্বপ্ন দেখতাম, বড় হয়ে বাবার মতন লেদ-অপারেটর হব।
“তখন আমার বয়স কম। তবু একটু একটু বুঝতে পারতাম আমরা খুব গরিব। টাকাপয়সার জন্যে অনেক কিছুই আটকে যেত। পুজোর সময় দোকানে গিয়ে যে জামাটা পছন্দ হত, সেটা কেনা হত না। নতুন বই কেনা যেত না, সেকেন্ড হ্যান্ড বই দিয়ে পড়াশোনা চালাতে হত। পাহাড় আর সমুদ্রের কথা বইয়েই পড়তাম, কোনওদিন দেখতে যাওয়া হয়নি।
“কিন্তু কখনও সেসব নিয়ে বায়না করিনি। ছোট হলেও ভেতরে ভেতরে নিশ্চয় বুঝতে পারতাম, আমাকে যা যা দিতে পারছে না তার জন্যে বাবা-মার মনেও কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু একটা সময় আর পারলাম না। আমার অনেকগুলো বন্ধু ওই বছরেই সাইকেল কিনে ফেলল।
“ছোটবেলায় একটা সাইকেল ছিল আমাদের স্বপ্ন। সাইলকেল মানে স্টাইল। সাইকলে মানে স্পিড। একটা সাইকেল থাকা মানে বড় হয়ে যাওয়া। এর-ওর কাছ থেকে সাইকেল চেয়েচিন্তে, পড়েঝরে, হাত-পা কেটে, চালানোটা শিখে নিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তো আমাকে সারাক্ষণ চালাতে দেবে না। আমি তাই মায়ের কাছে বায়না ধরলাম, আমারও একটা সাইকেল চাই। এক্ষুণি।
“মায়ের মুখ শুকিয়ে গেল। বলল, ‘এখন সাইকেল কেনার টাকা কোথায় পাবো বাবা? দেখছিস, পয়সা নেই বলে তোর স্কুলের জুতো কিনে দিতে পারলাম না।’
“আমি কিন্তু গোঁ ছাড়লাম না। একদিন দুদিন তিনদিন ধরে সারাক্ষণ বাবা-মার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে যেতে লাগলাম – ‘সাইকেল দাও, সাইকেল চাই, সাইকেল দাও।’
“বাবা যে কোত্থেকে টাকার জোগাড় করেছিলেন জানি না। একদিন সন্ধেবেলায় হঠাৎ আমাদের একতলা ভাড়াবাড়ির দরজার বাইরে ক্রিং-ক্রিং শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখি, বাবা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। গায়ে তখনও কারখানার তেলচিটে ইউনিফর্ম। চুলে ধুলো, হতের আঙুলে পোড়া মোবিলের দাগ। কিন্তু মুখে যে হাসিটা ঝকমক করছে সেরকম হাসি বাবার মুখে শেষ কবে দেখেছিলাম মনে পড়ে না।
“বাবা যে সাইকেলটার ওপর বসেছিলেন, সেটা ঠিক বাবার হাসির মতনই ঝকমকে। আমি সঙ্গে সঙ্গে দুহাত তুলে এমন একটা চিৎকার ছেড়েছিলাম যে, ভাবলে এখনও লজ্জা লাগে।
“সেই হল আমার এই টমটম। টমটম নামটা দিয়েছিলাম ফ্যান্টমের কমিকস থেকে। তুমি ফ্যান্টমের কমিকস পড়েছ? আমি পড়তাম বাংলা অনুবাদে, সেখানে ফ্যানটমের নাম ছিল অরণ্যদেব আর তার দুই ছোট্ট বন্ধুর নাম রাজা আর টম। আমার ডাক নাম রাজা। তাই আমার বন্ধুর নাম দিলাম টমটম।
“নতুন অবস্থায় টমটমকে যে কী সুন্দর দেখতে ছিল, কী বলব! অলিভ গ্রিন রং থেকে যেন আলো ঠিকরোত। তার সঙ্গে ম্যাচিং সবুজ হ্যান্ডেল-গ্রিপ, সবুজ সিট-কাভার, লাল-সবুজ চাকার ব্রাশ।
“আমি লুকিয়ে লুকিয়ে টমটমকে আদর করতাম। টমটমের গায়ে একটু কাদা ছিটকে লাগলে আমি কেরোসিন তেলে নেকড়া ভিজিয়ে ঘষে ঘষে সেই দাগ তুলতাম। প্রত্যেকটা স্ক্রু নিজের হাতে টাইট দিতাম। দুদিন অন্তর সাইকেলের দোকানে গিয়ে নিজের হাতে চাকায় পাম্প দিতাম। মোটকথা টমটমকে পেয়ে আমার দিনগুলোই যেন বদলে গিয়েছিল।
“সাঁতার কাটা ছেড়ে দিলাম, ফুটবল খেলা ছেড়ে দিলাম। সময় পেলেই, টমটমের পিঠে চেপে উত্তরপাড়া আর হিন্দমোটরের রাস্তায় রাস্তায় শুধু বনবন করে চক্কর কেটে বেড়াতাম।
“এই আনন্দের দিনগুলো বেশিদিন রইল না। বড়জোর ছ মাস। আমি ক্লাস নাইনে উঠতেই বাবা মারা গেলেন। কী যে হয়েছিল, আজও ভালো করে জানি না। একদিন মাঝরাত্তিরে খুব বুকে ব্যথা শুরু হল। ভোর হবার আগেই সব শেষ।
“বাবা মারা যাবার পরেই অভাব আমাদের গলা টিপে ধরল। জমানো পয়সাকড়ি বলতে কিছুই প্রায় ছিল না। দুমাসের মাথায় একদিন স্কুলে যাবার জন্যে চানটান করে আসনে বসে ডাকলাম, ‘মা, ভাত দাও।’ রোজই যেমন ডাকি। মা দেখলাম কপালে হাত দিয়ে রান্নাঘরের মেঝেয় বসে কাঁদছে। ভাত হয়নি। চাল নেই।
“ওইদিনই আমি বড় হয়ে গেলাম, হ্যাঁ, যদিও তখন আমার মাত্র চোদ্দো বছর বয়েস। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে রমেনকাকার দোকানে গিয়ে দাঁড়ালাম। রমেনকাকা ছিলেন আমার বাবার বন্ধু। রাস্তার উলটোদিকে একটা চশমার দোকান ছিল তার। রমেনকাকাকে বললাম, ‘রমেনকাকা, আমাকে একটা কাজ দিতে পারো?’
“রমেনকাকার বুকের ভেতরে কী হয়েছিল জানি না, বাইরে কিন্তু কোনও মায়াদয়া দেখালেন না। খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘তোর তো সাইকেল আছে?’
“আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
“‘আমি বকাইকে বলে দিচ্ছি। কাল থেকে বাড়ি বাড়ি কাগজ দিতে লেগে যা।’
“কাগজ মানে খবরের কাগজ। নিউজ-পেপার। লেগে গেলাম বাড়িতে বাড়িতে খবরের কাগজ দেওয়ার কাজে। যে-আমাকে ঠেলেঠুলে আটটার আগে বিছানা ছেড়ে নড়ানো যেত না, সেই আমিই টমটমকে নিয়ে সকাল ছটায় উত্তরপাড়া স্টেশনে পৌঁছে যেতাম। ট্রেনের ভেন্ডার-কামরায় চেপে ওই অত সকালেই কলকাতা থেকে বান্ডিল বান্ডিল নানান নামের কাগজ আর ম্যাগাজিন এসে প্লাটফর্মে নামত। বকাইদার কাছ থেকে আমার ভাগের কাগজ আর ম্যাগাজিনগুলো বুঝে নিয়ে টমটমের কেরিয়ারে সেগুলোকে চাপিয়ে ঝড়ের গতিতে বাড়ি বাড়ি বিলি করে বেড়াতাম।
“ঋকবাবু, আমি তো তখন তোমার মতনই ছোট ছিলাম। ছোটরা দুঃখকষ্টের কথা বেশিক্ষণ ভাবতে পারে না। আমিও নতুন কাজটার মধ্যে বেশ একটা মজাই পেয়ে গেলাম। চলন্ত সাইকেল থেকে টিপ করে তিনতলা চারতলার ফ্ল্যাটের বারান্দায় রোল-করা কাগজ ছুঁড়ে দেওয়াটা একটা খেলার মতনই লাগত। আর তাছাড়া, আগে যেসব পত্রিকা শুধু দূর থেকে দেখতাম – পয়সার অভাবে কিনতে পারতাম না – তখন সেগুলো সব আমার হাতের মুঠোয় চলে এল। গ্রাহকের ঠিকানায় ডেলিভারি দেওয়ার আগে সবকটা ছোটদের ম্যাগাজিন নিজে পড়ে নিতাম।
“কিন্তু কাগজ বিলি করে বেশি পয়সা তো পেতাম না। মা বাড়িতে বসে ব্লাউজ সেলাই করতে শুরু করল। তাতেই বা কটা টাকা পাওয়া যেত? এমন অবস্থা হল যে, স্কুলের সামান্য কটা টাকা মাইনে – সেটাও দিতে পারছিলাম না। আবার গিয়ে দাঁড়ালাম রমেনকাকার কাছে। রমেনকাকা এবার একটু চিন্তায় পড়ে গেল। বলল, ‘এখন থেকে কাজে লেগে যাবি? পড়াশোনাটা আর চালাবি না?’
“আমি চমকে উঠলাম। বললাম, ‘না, না রমেনকাকা। পড়াশোনা ছাড়তে পারব না।’
“‘তাহলে? তোর স্কুলের টাইমটাই তো আসল অফিসটাইম। চাকরি করতে হলে তো ওই সময়েই করতে হবে।’
তারপর আরেকটু ভেবে বললেন, ‘সন্ধেবেলায় ঘণ্টা-দুয়েক সময় দিতে পারবি? কাঁঠালবাগান বাজারে আমার এক বন্ধুর মুদিখানা আছে। সে একজন ডেলিভার-বয় খুঁজছিল। মানে ওই সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি চালডাল মশলাপাতি পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে। পারবি?’
“একটা ঢোঁক গিললাম। পরের বছর মাধ্যমিক। সকালবেলায় পড়তে পারছি না। সন্ধেবেলাটাও যদি যায়… তারপরেই মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেল। ঘাড় হেলিয়ে বললাম, ‘পারব রমেনকাকা। তুমি ওই দোকানে একটু বলে দাও।’
“পারলাম, সত্যিই পারলাম, জানো ঋকবাবু। দাঁতে দাঁত চেপে চারটে বছর ওইভাবে সকালে কাগজ আর সন্ধেবেলায় মুদিখানার জিনিস বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সংসার আর নিজের পড়াশোনাটা কোনওরকমে চালিয়ে নিয়ে গেলাম। পড়ার জন্যে আমার হাতে ছিল শুধু রাত্তিরবেলাটা। রাত জেগেই পড়তাম। তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমি স্কলারশিপ পেলাম। টিউশনিও শুরু করলাম অনেকগুলো। দিনগুলো অনেক সহজ হয়ে গেল।
“দুঃখ কি জানো ঋকবাবু? ওই চার বছরে আমার বন্ধু টমটমের বয়স অনেক বেড়ে গেল। আসল খাটুনিটা আমার হয়ে তো ওই-ই খেটেছিল। ওর দু হ্যান্ডেলে কুড়ি কুড়ি চল্লিশ কেজির দুটো থলি আর ক্যারিয়ারে আরও দুটো চালের বস্তা নিয়ে দিনের পর দিন ভাঙাচোরা জলজমা রাস্তায় দৌড়েছি। ওকে দেখার, ওকে একটু যত্ন করার সময়ই ছিল না।
“দোকানের কাজ ছাড়ার পর যখন ওর দিকে তাকানোর সময় পেলাম, তখন দেখলাম ওর মাডগার্ডগুলো মরচের কামড়ে খুবলে গিয়েছে। অত সুন্দর সবুজ রঙের চিহ্নও নেই। রুপোর আংটির মতন ঝকঝকে রিমদুটো জল লেগে লেগে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকদিন বাদে ওর গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে সেদিন কেঁদে ফেলেছিলাম।
“যতটা পারি ওকে সারিয়ে তুললাম। তারপর থেকে আর টমটমকে কাছছাড়া করিনি।”

 

তিন

তারপর থেকে ঋক আর কখনও আমাকে ‘সাইকেল চালাও কেন’ জিগ্যেস করেনি।
দেখতে দেখতে দুর্গাপুরে দু বছর কেটে গেল। ঋক ক্লাস নাইন থেকে টেনে উঠল ভালো রেজাল্ট করে। মিলাবৌদি আমাকে মাছের কচুরি বানিয়ে খাওয়ালেন। তারপর থেকেই ঋকের রেজাল্ট খারাপ হওয়া শুরু হল। সুমিতদা আর বৌদির হাসিমুখে সেই প্রথম আমি দুঃখের ছায়া দেখতে পেলাম।
মাধ্যমিকটা ঋক কোনওরকমে পাশ করল। সুমিতদা একেবারে ভেঙে পড়লেন। একদিন অফিসে ওঁর চেম্বারে ঢুকে দেখলাম দুহাতে কপালটা টিপে ধরে মাথা নিচু করে বসে আছেন। আমি কিন্তু কিন্তু করে বললাম, “সুমিতদা, সন্ধেবেলায় তো আমার হাতে তেমন কোনও কাজ থাকে না। ঋকের অঙ্ক ইংরিজিটা একটু দেখে দেব?”
সুমিতদা মুখ তুলে তাকালেন। বললেন, “কোনও লাভ হবে না মুখার্জি। পড়াশোনা থেকে ওর মনটাই একেবারে চলে গেছে। সারাক্ষণ ল্যাপটপ নিয়ে পড়ে থাকে। গেমস্ খেলে, গেমস্। ওই কম্পিউটারই ওকে শেষ করে দিল।”
আমি বললাম, “কিনে দিলেন কেন?”
সুমিতদা বললেন, “কিনে দিলাম কী সাধে? কী অসম্ভব জেদ ধরেছিল সে তোমাকে কী বলব? একটা সময় আমি আর তোমার বৌদি ভয় পেয়ে গেলাম। মনে হল কম্পিউটার না পেলে ও হয়তো সুইসাইড করে বসবে।”
তারপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, “যতক্ষণ ওই কম্পিউটারের ভূত ওর মাথা থেকে না নামে, ততক্ষণ স্বয়ং আর্যভট এসে অঙ্ক কষালেও ওর কিছু হবে না।”
ঋক ইলেভেনে পড়ছে। চোখমুখ পালটে গেছে। সেই মিষ্টত্ব কোথায় উধাও! চেহারা আর কথাবার্তা সবকিছুতেই কেমন যেন রুক্ষ্মতা। আমি কয়েকবার ওকে বোঝাবার চেষ্টা করতে গিয়ে অপমানিত হলাম। তারপর নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। কুড়ির নয় আর কুড়ির দশ ভাবা রোডের মধ্যে যাতায়াত আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। তারপর হঠাৎই একদিন আমাকে বদলি করে দেওয়া হল মধ্যপ্রদেশের একটা ইউনিটে।
যাবার আগে সুমিতদা আর বৌদির সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। বৌদি বললেন, “ভালো থেকো। ফোনে যোগাযোগ রেখো।” সুমিতদা ছাদের দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন। কিছু বললেন না। ঋককে ডাকলাম। ও পড়ার ঘর থেকে বেরোল না।
নতুন জায়গায় গিয়ে কিছুদিন সুমিতদার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলাম। ফোন করলেই ঋকের সম্বন্ধে নানান অভিযোগ জানাতেন। নতুন নতুন সফটওয়্যার কেনার জন্যে নাকি জলের মতন পয়সা খরচ করছে। নিজেই লুকিয়ে লুকিয়ে নেটে অর্ডার দেয়। বাড়িতে জিনিস পৌঁছে গেলে দাম মেটাতেই হয়। বেশিরভাগ সময় বৌদি সুমিতদাকে লুকিয়ে সেই দাম মেটান।
বছর দুয়েক বাদে সুমিতদার সঙ্গে ফোনে কথা বলাটাও একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। সুমিতদা ওঁর মোবাইলের নম্বর চেঞ্জ করলেন নাকি নম্বর সারেন্ডারই করে দিলেন জানি না। মোট কথা ওঁকে ফোনে আর ধরতে পারছিলাম না।
আমার এক প্রিয় বন্ধু এবং সহকর্মী তখনও দুর্গাপুরেই ছিল। তার নাম শুভঙ্কর। শুভ বলেই ডাকতাম। সেই শুভর কাছ থেকেই একদিন ভয়ঙ্কর অশুভ খবরটা পেলাম। সুমিতদা মারা গেছেন।
“সেকী, কেমন করে!” আমি ফোনের মধ্যেই চিৎকার করে উঠলাম।
শুভর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। কোনওরকমে বলল, “কার অ্যাকসিডেন্টে। নিজেই ড্রাইভ করে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। গান্ধি-মোড় ছাড়িয়েই একটা লোহার বিলেট বোঝাই ট্রাকের সঙ্গে হেড অন কলিশন হয়। সঙ্গে সঙ্গেই সব শেষ। এত অন্যমনস্ক থাকতেন আজকাল।”
আমি কোনও কথা না বলে ফোনটা নামিয়ে রাখলাম। এরপর শুভর কাছ থেকেই মিলাবৌদি আর ঋকের টুকটাক খবরাখবর পেতাম। ওদের অবস্থা ভালো নয়। সুমিতদা নাকি রিসেন্টলি অনেক লোন নিয়ে টাউনশিপের বাইরে এক্সপ্রেসওয়ের পাশে একটা ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। তাই অফিস থেকে টাকাপয়সা তেমন কিছু পাননি ওঁরা। ঋকের পড়াশোনা চালানোই মুশকিল।
তারপর একদিন শুভ বলল, “মিলাবৌদিরা টাউনশিপ ছেড়ে চলে গেছেন। আর ওদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই।”
কেবলই মনে পড়ছিল সেই হাসিখুশি সুন্দর পরিবারটার কথা। ছ বছরে মানুষের জীবন কতখানি বদলে যেতে পারে তাই ভাবছিলাম। সেই ভাবা রোডের বাগানঘেরা বাড়ি, জানলা খুললে নাচন রোডের আঁকাবাঁকা সবুজ আলপনা, সুমিতদার সঙ্গে দাবাখেলা, বৌদির হাতের জলখাবার আর সর্বোপরি ঋক নামের সেই বাচ্চা ছেলেটার নানান আবদার – সবই এখন একটা ক্লোজড চ্যাপটার হয়ে গেল।
যখন এ কথা ভেবেছিলাম তখনও বুঝিনি, এত সহজে কোনও চ্যাপটার ক্লোজড হয় না।
চার

আরও চার বছর বাদে একবার দুর্গাপুরে ফিরে গেলাম। সেই যে আমার বন্ধু শুভ, তার বিয়েতে যেতে পারিনি। এবার মেয়ের অন্নপ্রাশন। হুমকি দিয়েছিল – না গেলে আর যোগাযোগ রাখবে না। তাই অতি কষ্টে ছুটি জোগাড় করে চলে গেলাম দুর্গাপুর।
শুভ স্টিল-প্ল্যান্টের গেস্ট হাউসে ঘরের ব্যবস্থা করে রেখেছিল। কথা ছিল ওখানে লাগেজ রেখে, তৈরি হয়ে ওর কোয়ার্টারে চলে যাব। কিন্তু এরকম খালি হাতে তো যাওয়া যায় না। ওর মেয়ের জন্যে উপহার তো নিতে হবে। তাই একটা রিক্সায় চড়ে বললাম, “বেনাচিতি বাজার চলো।”
বেনাচিতি বাজারটাই দুর্গাপুরের মেন মার্কেট। তখন সবে বিকেল হচ্ছে। সব দোকানের শাটার খোলেনি। আমি মন দিয়ে রাস্তার দুপাশের দোকানগুলো দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম – খেলনার দোকান পেরিয়ে না চলে যাই।
হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন ডেকে উঠল, “কাকু, কাকু!”
আমাকেই যে ডাকা হচ্ছে সেটা প্রথমে বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারলাম যখন রিক্সার পাশে পাশে দৌড়ে এল বাইশ-তেইশ বছরের একটা ছেলে। মুখে তখনও ওই ডাক – “মুখার্জিকাকু, দাঁড়ান, দাঁড়ান। আমাকে চিনতে পারছেন না?”
চিনতে পেরেই রিক্সা থেকে নেমে পড়লাম। প্রায় দশ বছর বাদে ওকে দেখছি, তবু ঋকের মুখ ভুল হবার নয়। ঋক আমাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার চেষ্টা করতেই ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। ঋক বলল, “রিক্সাটা ছেড়ে দিন কাকু। অনেক কথা জমে আছে।”
আমারও অনেক কিছু জানার ছিল। ঋক এখনও দুর্গাপুরেই রয়েছে? কী করছে ও? মিলাবৌদিই বা কেমন আছেন? দু-একটা প্রশ্ন করতেই ঋক বলল, “সব বলছি। আগে আপনি আমার দোকানে চলুন।”
“তোমার দোকান!”
“চলুন না দেখবেন।” রহস্যময় হেসে জবাব দিল ঋক।
দেখলাম। দোকান বললে খুব কম বলা হয়। বেনাচিতির বড় রাস্তার ওপরেই বিশাল একটা শো-রুম। কাচের স্যুইং-ডোর ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। বুঝলাম পুরো ফ্লোরটাই এয়ার কন্ডিশনড। দেয়াল জুড়ে সারি সারি সেল্ফের ওপর সাজিয়ে রাখা আছে নানা ব্র্যান্ডের কম্পিউটার, প্রিন্টার, সাউন্ড-বক্স এবং আরও কত কী। এত কম বয়সে ঋক এরকম একটা ব্যবসা গড়ে তুলেছে! কেমন করে? শুনেছিলাম যে, ওদের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়?
একটা অ্যান্টিচেম্বারে নিয়ে গিয়ে ঋক আমাকে যত্ন করে বসাল। তারপর আমার জন্যে কফি আনতে দিয়ে আমার উলটোদিকে বসল। মুখে খুশির হাসি।
বললাম, “এতকিছু কেমন করে করলে ঋক?”
“খুব কষ্ট করে করেছি কাকু। কষ্ট করা কাকে বলে সে তো আপনি জানেন। বাবা যখন মারা গেলেন, তখন অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম না।
“টাউনশিপের কোয়ার্টার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হল। ওদিকে পুরো টাকা মেটানো হয়নি বলে নতুন ফ্ল্যাটেও মালিক ঢুকতে দিলেন না। এই বেনাচিতির পেছনেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে আমি আর মা থাকতে শুরু করলাম।
“ওই কষ্টের দিনগুলোতে খালি আপনার কথা মনে পড়ত। আপনার সেই টমটমের গল্প। খালি ভাবতাম, আমার যদি টমটম থাকত!
“তারপর একদিন খেয়াল হল, টমটম নেই তো কী হয়েছে? কম্পিউটারটা তো রয়েছে। ওটা তো আমি ভালোই বুঝি। ওই তো আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু, যেমন টমটম ছিল আপনার বন্ধু।
“‘সাইবার-ক্যাফে-র আইডিয়াটা তখন সবে এদিকে ওদিকে মাথাচাড়া দিচ্ছে। দুর্গাপুরে অনেকগুলো প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজও তৈরি হয়েছে। বাইরের প্রভিন্সের ছেলেমেয়েরা এখানে এসে নেটের কানেকশন খোঁজে। আমি ছোট্ট একটা ঘর ভাড়া নিয়ে আমার সেই একটা মাত্র কম্পিউটার দিয়েই একটা সাইবার-ক্যাফে চালু করলাম।
“তারপর আর কী? ঠিক সময়ে ঠিক জিনিস নিয়ে এলে যা হয়। একটা থেকে দুটো, দুটো থেকে সাতটা কম্পিউটার হল। তারপর দেখলাম পার্সোনাল-কম্পিউটারের ডিমান্ড বাড়তে শুরু করেছে। একটা কোম্পানির এজেন্সি নিয়ে নিজেই ঘুরে ঘুরে কম্পিউটার-হার্ডওয়ার বিক্রি করতে শুরু করলাম। দিবারাত্রি খাটতাম। খুব যখন ক্লান্ত লাগত, তখন আপনার কথা ভাবতাম। চোখের সামনে দেখতাম, সাইকেলে চেপে একটা ষোলো বছরের ছেলে টাল খেতে খেতে বাড়ি থেকে বাড়ি চাল-ডাল-সর্ষের তেল পৌঁছে দিচ্ছে।”
আরও কিছুক্ষণ ঋকের সঙ্গে গল্প হল। শো-রুমে কাস্টমারের ভিড় শুরু হয়েছিল। আমি বেরোবার জন্যে উঠে দাঁড়ালাম। ঋককে কথা দিতে হল, দুর্গাপুর ছাড়ার আগে ওর নতুন ফ্ল্যাটে যেতে হবে। ঋক মুচকি হেসে বলল, “মা কিন্তু এখনও আগের মতনই ডিলিশাস মাছের কচুরি বানায়।”
শো-রুমের বাইরে বেরিয়ে এলাম। ঋক আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “কোম্পানির নামটা নিয়ে কিছু বললেন না?”
আগে খেয়াল করিনি। ওর কথায় ঘাড় তুলে তাকালাম। অন্ধকার নেমে গেছে বলে ঋকের কর্মচারীরা শো-রুমের মাথায় বিরাট গ্লো-সাইনবোর্ডটা জ্বালিয়ে দিয়েছে। আলোর অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে ছ-টা অক্ষর। টি ও এম টি ও এম – টমটম।

ছবিঃ পার্থপ্রতিম দাস

To Top