অমর মিত্র নিমকি বুঁদে লেডিকেনি

চরিত্রলিপি
মধুসূদনঃ রিকশাওয়ালা, বছর ৪৫-৫০
হুতুমঃ বেঁটে চশমা পরা ডাকাত, বছর ২৫-২৬
ভুতুমঃ লম্বা কানে যন্তর পরা ডাকাত, বছর ২৫-২৬
ঘোতনঃ মোটাসোটা দারোগার চর, বছর ৩০
কপিলঃ দারোগা, বছর ৫০
রিকশাঃ তুফানচন্দ্র মেল

[মঞ্চের এক কোণে একটি ভাঙাচোরা রিকশা। রিকশা আবার গরু বাঁধার দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বাঁধা। একটি লোক বছর ৪৫-৫০, রিকশাওয়ালা শ্রীমধুসূদন একা বসে বসে বিড়বিড় করছে, “কাচা পেঁপে পাকা পেঁপে, কাচা পেঁপে পাকা পেঁপে…”
এটি একটি গণ্ডগ্রাম। এই মধুসূদন একটু পাগলা টাইপের। কথায় কথায় ভূত দ্যাখে। নানা রকম অদ্ভুতে বিশ্বাস করে। সে ওই কথা থামিয়ে এবার বলছে “বাবলা গাছে বাঘ উঠেছে…” মঞ্চে সে একা। দাঁড়িয়ে হেলেদুলে ওই কথা বলে যাচ্ছে। তখন দুটি লোক ঢুকল মঞ্চে। তারা হুতুম আর ভুতুম, দুই ডাকাত। দুজনের পিঠে দুটি বস্তা। ডাকাতি হোক, চুরি হোক, মাল নিয়ে ফিরছে। এখন সকাল। পাখি ডাকছে। গ্রামের সকাল যেমন হয়। হুতুম, ভুতুম দুজনে বছর ৪০, আধবুড়ো ডাকাত। একজন বেঁটে, একজন লম্বা। একজনের লাল গেঞ্জি, অন্যজনের কালো গেঞ্জি। বেঁটে হুতুমের চশমা আছে। লম্বা ভুতুমের কানে হিয়ারিং এইড। তারা এসেছে রিকশা ভাড়া করতে। ডাকাতির মাল বয়ে ক্লান্ত না। আর পারছে না।]
হুতুম।। উফ্‌, ভুতুম তোরে বললাম, এনামেল, প্লাস্টিকের জিনিস নে, কাপড়চোপড় নে, ওতে ওজন কম হয়। নিলি কাঁসা, কাঁসা আর ল-য় কী তফাত, উফ্‌, কী ভার, পারিনে, হামানদিস্তে আর শিলনোড়াও নিলি।
ভুতুম।। হুতুম তুই চোখে দেখিস যে বুঝবি, কাঁসা আর ল-য় তফাত জানিস? প্লাস্টিকের কোনও দাম আছে? আর পুরোনো জামাকাপড় কেউ ডাকাতি করে? ওসব ফিরিতে দিয়ে দেয় গেরস্ত, মিক্সি-ফিক্সি এসে মশলা বাটার শিলনোড়া উঠে গেছে, হানদিস্তেও, ওসবের খুব দাম।
হুতুম।। কাঁধ ভেঙে যাচ্ছে, বাপরে কাঁসার থালা-বাসনের কী ভার, এই রিশকা যাবে?
মধু।। কাঁচা পেঁপে পাকা পেঁপে…
ভুতুম।। কী বলে রে?
হুতুম।। কাঁচা… ধুত আমি পারবনি, কাকা, পাকা, কেঁচে চেকে।
ভুতুম।। উফ্‌, আমি ধরতে পারছি নি, হ্যাঁ রিশকা যাবে?
মধু।। বুজতে পারচ না?
ভুতুম।। কী বুঝব, যাবে এই রিশকা?
মধু।। বাবলা গেছে বাঘ উঠেছে।
হুতুম।। এই এই রিশকা যাবে?
মধু।। কাগের ঠ্যাঙ বগের ঠ্যাঙ, হলদি বনে কুনো ব্যাঙ।
হুতুম।। কী হচ্ছে কী, কথা কানে যাচ্ছে না?
মধু।। আনি মানি জানিনে, পরের ছেলে মানিনে, সক্কাল বেলায় তুমরা কারা হুতুম ভুতুম, বস্তা কাঁধে কোথায় যাবে?
হুতুম।। এই নাম জানলে কী করে?
ভুতুম।। হুতুম, ও নাম জানল কেমনে, বল ওইটা মোদের নাম না।
হুতুম।। সত্যি ভুতুম, ও জানল কী করে মোদের নাম?
মধু।। হুতুম ভুতুম… কুটুম কাটুম, এই যা দেখি, সক্কাল বেলায় আমার গলা সাধায় বিঘ্ন ঘটালি, কাঁচা পেঁপে পাকা পেঁপে…
ভুতুম।। রিশকা যাবে কি না বলো?
মধু।। আমারে জিজ্ঞাসা করলে হবে, আমি কি রিকশা, ওরে বলো।
হুতুম।। অ্যাই, ফালতু কথা বলবে না, মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে।
মধু।। হুতুম ভুতুম, ঝামেলা কোরো না, কাঁচা পেঁপে পাকা পেঁপে।
হুতুম।। অ্যাই, আমি কেডা জানিস?
মধু।। ভুতুম।
হুতুম।। কিসসু জানিসনে, আমি হচ্ছি হুতুম।
মধু।। ও বুঝলাম, তুমি হলে ভুতুম, উনি হল হুতুম।
হুতুম।। উফ্‌, আমি হুতুম, হুতুম।
ভুতুম।। আর আমি হচ্ছি ভুতুম ভুতুম।
মধু।। আচ্ছা, তুমি হুতুম ও ভুতুম, ও ভুতুম, তুমি হুতুম, সক্কালে কী সমাচার?
ভুতুম।। আগে জান আমরা কোনজন কেডা, তারপরে আচারবিচার।
মধু।। বাগলা বাছে বাব উটেচে, কী করতে এই সক্কালে হুতুম-ভুতুম?
হুতুম।। সুপুরিঘাটা যাব, গাঙ পাড়ে।
মধু।। কোন গাঙ?
হুতুম।। পাড়ের গাঙ।
মধু।। কোন পাড়?
হুতুম।। এপার-ওপার।
মধু।। গাঙে অনেক জল।
ভুতুম।। জল আছে তাই তো গাঙ।
মধু।। রিকশা কি গাঙ পার হতি পারবে?
হুতুম।। নৈকোয় পার হব, রিশকা গাঙ পাড়ে থাকবে।
মধু।। ও গইন গাঙের পানি, তুমারে আমি জানি, রিকশা যাবে কিনা খোঁজ নাও, ও বলবে।
হুতুম।। কেডা, ওই উনি? (রিকশার দিকে তর্জনী তোলে)
মধু।। হ্যাঁ উনি, ছিরিমান তুফানচন্দর মেইল।
ভুতুম।। ওর নাম?
মধু।। তবে কি তুমার নাম?
হুতুম।। রিশকার নাম?
মধু।। হ্যাঁ, উনার নাম, উনার বাবার নাম হাসনাবাদ এক্সপ্রেস, ঠাকুদ্দা সোলাদানা মেইল, বলো, তুমরা কী চাও হু, ভু?
হুতুম।। গাঙ পাড়ে যাব, ওপাড়ে রসপুঞ্জ গাঁয়ে।
মধু।। রসপুঞ্জে কেডা থাকে।
হুতুম।। আমার ভায়রা দিনু ময়রা।
ভুতুম।। আমার মাসতুতো ভাই কিনু মণ্ডল।
মধু।। কেমন মাসি?
ভুতুম।। ছোটমাসি।
মধু।। কত বয়েস?
ভুতুম।। বায়ান্ন কী তিপ্পান্ন।
মধু।। মিথ্যে কথা।
ভুতুম।। তার মানে?
মধু।। ছোটমাসির অত বয়েস হয়, আমার ছোটমাসি তিন বছর।
ভুতুম।। আমার মাসি আমি জানব না?
মধু।। না, ভুল বলছ বুঝাই যাচ্ছে, উনি তোমার ঠাকমা হবে।
হুতুম।। সে না হয় হল, তাতে রিশকার কী হল?
মধু।। সব হল, কুথায় যাবে পেসেঞ্জার তা না জেনে আমার তুফান-ভাইয়ের চাকা গড়ায় না।
ভুতুম।। বললাম যে গাঙ-পাড়ে।
মধু।। এই বলছ রসপুঞ্জ, এই বলছ গাঙ-পাড়, গাঙ-পাড় তো সুপুরিঘাটা।
হুতুম।। আরে রসপুঞ্জ তো ওপাড়ে, গাঙ-পাড়ে দিয়ে এসো।
মধু।। কারা কারা যাবে, আর কারা কারা থাকবে?
হুতুম।। তার মানে?
মধু।। মানে চারজন যাবে?
হুতুম।। চারজন কোথায়, আমরা তো দুজন।
মধু।। আমি দেখতিছি চার জন, তুমি বলতেছ দুজন!
হুতুম।। হুতুম আর ভুতুম, কজন হয়?
মধু।। আসলে আমারে নিয়ে হয় পাঁচজন।
ভুতুম।। অঙ্কে বাল্মীকি এই লোকটা। আমরা দুজন আর তুমি, সবে মিলে তিনজন, কিন্তু রিশকাওয়ালারে কি গুনতি করতে হয়?
মধু।। রাম দুই তিন চার, তোমরা হলে পাঁচজন, আমি নিয়ে পাঁচ আর রিকশা নিয়ে ছয়, কজন যাবা?
ভুতুম।। আমরা দুই।
মধু।। আচ্ছা, তার মানে হুতুম-ভুতুম যাবে, তাদের সঙ্গের জন যাবে না, রিকশা দুজনের বেশি হবেও না, তুফান মেলের বয়েস হয়েছে তো তোমার বড়পিসির মতো, বায়ান্ন-তিয়ান্ন, বেশি ভার নিতে পারে না, আজ চাকার পাম ফুস, কাল হ্যান্ডেল বেঁকা, পরশু চাকা গড়াতিই চায় না, বেশি আরাম চায়, কী বুজলে?
ভুতুম।। বড়পিসি না ছোটমাসি।
মধু।। ওই হল, যা বায়ান্ন, তাই তিয়ান্ন, তুফান আমার বড়পিসি-মাসি বলো, ছোটমেসো-পিসে বলো, ময়রা বলো, ভায়রা বলো সব, চলো দুজন, তুফান থাকুক, আমি নে যাই তোমাদের।
ভুতুম।। তার মানে?
মধু।। চলো, আমি যাচ্ছি।
হুতুম।। রিশকার বাঁধন খোলো।
মধু।। ও যাবে না, কাল রাতি জ্বর এয়েছিল।
ভুতুম।। জ্বর তো মনে হচ্ছে না, বেশ তো কাচা পেকে পাকা কেকে করে যাচ্ছ।
মধু।। আমার না ওর। (রিকশা দেখায়)
হুতুম।। অ্যাই, ইয়ার্কি হচ্ছে, রিশকার জ্বর।
মধু।। এই ওরে অপমান করতেস কেন?
হুতুম।। কীসের অপমান?
ভুতুম।। তুমি বড্ড ঠ্যাঁটা, রিশকা নে চল।
মধু।। এই আমার রিকশারে রিশকা বলতেস কেন তুভুম?
ভুতুম।। তুভুম না ভুতুম, রিশকারে কী বলব রিশকা ছাড়া, মোটর গাড়ি?
মধু।। না তুমি তুভুম, এই রিকশা বলো।
হুতুম।। বলছি তো রিশকা।
মধু।। না, রিকশা, দারোগাবাবু বলে গেছে, হেডমাস্টার বলে গেছে, এই তুমরা কারা, রিকশারে রিশকা বলো।
ভুতুম।। আমরা কারা, তোর রিশকা সমেত তোরে নিয়ে গাঙের জলে ফেলে দেব।
মধু।। ফের রিশকা বলতেস, খারাপ হচ্ছে কিন্তু।
হুতুম।। এ তো আচ্ছা রিশকাওলা, এই কান ফাঁক কর শুন লে, হামরা ডাকু আছি, ডাকু হুতুম, ডাকু ভুতুম, চ, চ, রিশকার জ্বর মামদোবাজি!
মধু।। হ্যাঁ জ্বর, হামদোবাজি, কেনে তুফানচন্দর কি মানুষ না?
হুতুম।। অ্যাই, অনেক হয়েছে, নে চ সুপুরিঘাটা।
মধু।। চল, আমি নে যাচ্ছি, ডাকু বলে ছাড় দিলাম, রিকশারে রিশকা বললে আমি দুই গালে দুই থাপ্পড় দেই হেড স্যারের মতো, বেঁচে গেলে।
হুতুম।। কে রে চাঁদু, ডাকুরে কেন ছাড় দিবি, আয় না দেখি থাপ্পড় মার।
মধু।। ডাকুর সঙ্গে কাকুর মিল, তাই।
হুতুম।। কাকুর সঙ্গে চাকুর মিল, ফাঁসিয়ে দেব পেট।
মধু।। আর কোনওদিন রিশকা বলোনি, বলবা না তো।
ভুতুম।। বললে হবে কী?
মধু।। দেখো একদিন কী হয়, ডাকুগিরি বেরিয়ে যাবে, আমি কত ডাকু দেখলাম, কেউ তোমাদের মতো রিশকা বলে না, মুখ্যু ডাকু।
ভুতুম।। ফের তুই ওসব বললি, ছাড় নেই, বস্তা দুটো মাথায় তোল তাইলে।
মধু।। মাথায় ফোড়া, চুলের ভারও নিতি পারতেছে না।
হুতুম।। তাইলে রিশকা বের কর।
ভুতুম।। আভি আভি, তুরন্ত যানা পড়েগা।
মধু।। বলতিছি রাতি ওর জ্বর এয়েছিল, থানার দারোগাবাবু, কপিল কুণ্ডু এসে পর্যন্ত পেল না, তো তুমরা।
হুতুম।। সেই মোটা দারোগা?
মধু।। না ফসসা দারোগা।
হুতুম।। বিড়ালের মতো কটা চোখ?
মধু।। আজ্ঞে না, লম্বা।
ভুতুম।। শুধু খৈনি ডলে?
মধু।। না, এক্কে চড়ে মশা মারে।
হুতুম।। সে এয়েছিল কেন?
মধু।। না, গুড়মুড়ি ভালোবাসে।
হুতুম।। গরমগরম কথা বলে?
মধু।। না আজ্ঞে, মাছ-মাংস খান না।
হুতুম।। এই চ, বস্তা মাথায় তোল।
মধু।। আজ্ঞে দারোগার মন ভালো।
ভুতুম।। দারোগার বাড়ি কোথায়?
মধু।। শ্বশুরবাড়ি নলডাঙা।
হুতুম।। আরে নিজির বাড়ি?
মধু।। এই তো আসবে এখন, আমারে বলে গেছে।
হুতুম।। সে কী, এই মধু, ইয়ার্কি হচ্ছে, দারোগা আসবে কেন?
মধু।। এর আগে ছিল হেকিমপুর, তার আগেতে যাদবপুর।
হুতুম।। ভুতুম, দারোগা এলি কী হবে?
মধু।। চোর-ডাকাতের লেজ হবে।
ভুতুম।। এই চুপ, ফটাস করে ফাটিয়ে দেব।
মধু।। রিকশা চেপে তদন্তে যাব।
ভুতুম।। কীসের তদন্ত?
মধু।। চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি, আমি কি অত জানি?
হুতুম।। কী সব্বোনাশ, দারোগা এলি আমাদের ধরবে, এই রিশকা বের কর, নইলে তোরে ফটাস করে দেব (বলে পকেট থেকে খেলনা পিস্তল বের করে)।
ভুতুম।। রিশকা বের কর, নইলে চাকু দিয়ে নাক কেটে দেব।
মধু।। আমি পারব না, দারোগা আমারে বলে গেছে এনকুমারিতি যাবে, আমি তার জন্য বসে আছি, জ্বর গায়ে তুফানও যাবে।
হুতুম।। তাহলে আমরা কী করব?
মধু।। তুমরা পালাও।
ভুতুম।। এই বস্তা দুটো কী হবে?
মধু।। বস্তা নিয়ে পালাও।
ভুতুম।। কাঁসার বাসন, ল-র হামানদিস্তে আর কড়াই, বড্ড ভার, রিশকা চাই।
মধু।। বাসন রেখে বস্তা নিয়ে পলাও।
হুতুম।। ফেলে যাব, কাঁসার বাসন কত দাম!
মধু।। ধরবে আর মারবে, গা-হাত-পা ভাঙবে।
হুতুম।। ভুতুম রে করবি কী?
ভুতুম।। বস্তা ফেলে পিঠটান দি।
[একটা লোক এল। যেমন বাঘের আগে আসে ফেউ, তেমনই দারোগার আগে ঘেউ, তার চর। তার নাম ঘোতন। সে দারোগাবাবুর হাত-পা টেপে। মোটাসোটা, নাদুসনুদুস। হাতে একটি মাছের থলে মানে এইটুকুনই ব্যাগ। তাকে দেখে হুতুম-ভুতুম বুঝতে পারছে না করবে কী?]
ঘোতন।। মধুদা, মধুবাবু, করছ তুমি কী?
মধু।। বাবলা গাছে বাঘ উঠেছে, দেখতে লেগেছি।
ঘোতন।। দারোগাবাবু বলল যখন-তখন আসতে পারে, রিকশা নিয়ে রেডি থাকো, সুপুরিঘাটা যাবে।
মধু।। গাঙধারে?
ঘোতন।। আমায় খবর দিতে বলল, আমি খবর দিলাম।
হুতুম।। কখন আসবে?
ঘোতন।। বলব কেন, তোমরা কারা।
হুতুম।। আমরা সকাল থেকে দারোগাবাবুর জন্যি বসে আছি, যাব সোলাদানা, সেখেন থেকে নড়িদানা, তা পার হয়ে নলডাঙা।
[ঘোতন ভ্রূ কুঁচকে দেখল দুজনকে। পরখ করল। হাতের থলের ভিতর থেকে একটা দূরবিন বের করে চোখে দিল। দেখল দুজনকে।]
ঘোতন।। নলডাঙা কেন?
হুতুম।। আমাদিগের বাটি, দারোগাবাবু মোদের জামাই।
ঘোতন।। তোমরা জানলে কী করে নলডাঙায় তেনার শ্বশুরঘর?
হুতুম।। আমারও ওই ঘর।
ভুতুম।। আমারও সেই ঘর।
মধু।। আরিব্বাস, সেই কথাটা বলোনি তো।
হুতুম।। বলব কী করে, কাচা পেকে পাকা কেকে করতে গিয়ে ভুলে মেরেছি, হ্যাঁ গো রিশকাওলা, আসবে তো দারোগাবাবু?
মধু।। ঘোতন যখন এয়েছে, দারোগাবাবু পাঠিয়েছে, হ্যাঁরে ঘোতনা কদ্দুর?
[ঘোতন দূরবিন চোখে দূরের দিকে তাকায়।]
মধু।। দেখা গেল?
ঘোতন।। মনে হয় যাচ্ছে।
হুতুম।। আসছে?
ঘোতন।। ধরা যাচ্ছে না, দাড়ি কামিয়ে গোঁপে তেল মাখাচ্ছে তাই দেখছি।
ভুতুম।। আমারে একটু দেবে, দেখব।
ঘোতন।। হবে না, পেরাইভেট, এই তোমরা যাও, দারোগাবাবু ডাকু খুঁজতে বেরোচ্ছে, ধরে দিতে পারলে ময়রার দোকানে লেডিকেনি আর নিমকি দিয়ে বুঁদে, সঙ্গে পাঁচশো করে পুরস্কার। [ঘোতন দূরবিনে চোখ রেখে ঘুরছে মঞ্চে।]
মধু।। আমার তুফানভাই তো খাবে না, নেবে না, আমার কী?
[একটু পাশে সরে গিয়ে হুতুম ভুতুম পরামর্শ করছে। বস্তা দুটি টেনে সরিয়ে নিয়ে গেল রিকশার আড়ালে। মধু আর ঘোতন তা দ্যাখেনি। ঘোতন তখন ধারাবিবরণী দিচ্ছে]
ঘোতন।। এই যে বেল্ট লাগাল কোমরে, দারোগাবাবু আসবে।
মধু।। টুপি দিল মাথায়?
ঘোতন।। দিয়ে আবার খুলে রাখল, আবার দিল, হাতে নিল রুল।
মধু।। আর পিস্তল?
ঘোতন।। কোমরে নিল পিস্তল, দানা ভরল ফটাস কল।
মধু।। বুট পরেছে বুট?
ঘোতন।। পরছে বুট, পালিশ বুট।
মধু।। [হাততালি দেয়] বাহ্‌ বাহ্‌, ফাটাফাটি, এই না হলে দারোগা।
[মঞ্চের অন্য ধারে হুতুম-ভুতুম কথা বলছে।]
হুতুম।। আমি অত ভার বয়ে সুপুরিঘাটা যেতি পারব না, বারবার বললাম, জামাকাপড়, প্লাস্টিকের জিনিস নে, ভার নেই ওসবে, এখন কী হবে, চ পালাই।
ভুতুম।। মালগুলো ফেলে?
হুতুম।। আমি পারব না নে যেতে।
ভুতুম।। আমিও না, ঠিক ছেল রিশকায় করে নে যাব, কিন্তুক ও রিশকা না রিকশা, রিশকা নে ঝামেলা পাকালো।
হুতুম।। ল’ আর কাঁসার বাসন কাঁধে নিলে আমি আরও বেঁটে হয়ে যাব, আমি চেপে এট্টুখানি হয়ে যাব।
ভুতুম।। না বরং আমরা পুরস্কার নিই, বলব ডাকাতির মাল উদ্ধার করে বসে আছি কপিল দারোগার জন্য, পুরস্কার আর লেডিকেনি, বুঁদে নিমকি, নিয়ে ঘরে যাই।
হুতুম।। [হাততালি] বাহ্‌, ভেরি ভেরি ভেরি গুড, পাউরুটি বিস্কুট।
ঘোতন।। অ্যাটেনশন, দারোগাবাবু কামিন।
হুতুম।। কামিন গোয়িং কামিন।
ভুতুম।। আসিতেছে আসিতেছে, আমতলির রিশকাতলিতে আসিতেছে, কপিল দারোগার ডাকাত ধরা।
মধু।। বসিরহাটের মিলনি সিনেমায় আসিতেছে, দুকুর দুটা, বিকাল পাঁচটা, কপিল দারোগার ডাকাত ধরা…
ঘোতন।। [দূরবীনে চোখ] রিচিং রিচিং, জয় দারোগার জয়।
হুতুম।। আর নাই কো ভয়।
[দারোগা ঢুকল লাঠি দুলিয়ে। দারোগার যেমন ড্রেস হয় তেমনই।]
দারোগা।। ঘোতন সব ঠিক হ্যায়?
হুতুম।। হায় হায় হায়।
দারোগা।। এই তুই কেডা? হু আর উ?
মধু।। পথিক দারোগাবাবু পথিক, হুয়ারিউ না।
দারোগা।। পথিক এখেনে কেন?
মধু।। আপনারে দেখতে, হুয়ারিউ ধরবেন তাই দেখতে।
দারোগা।। হুয়ারিউ?
ভুতুম।। হুজুর গরিব আদমি, একটা করে বস্তা পেয়েচি পথে যেতে, তাই নিয়ে আপনার জন্য বসে আছি।
মধু।। ও বাবা মোয়াদেব, তাই?
হুতুম।। তাই হুজুর, পথ দিয়ে দুটো ষণ্ডা লোক, ইয়া মোচ, একদম হুয়ারিউ, হুয়ারি হুয়ারি করে ফিরছিল, আমি বললাম হুয়ারিউ?
দারোগা।। নেক্সট।
ভুতুম।। হুজুর আনপড় আদমি, মাপ করে দিও বাবা কপিলমুনি, আমি বললাম, হারে রে রে রে রে রে… তাই শুনে তারা ভয় পেয়ে কেঁদে উঠল, ভূ ভূত ভূ ভূত, ভূত ভূত ভূত…
দারোগা।। ডাকু, ডাকু, মক্ষন সিং।
হুতুম।। তার ভাই লক্ষণ সিং, দুই ভাই, লম্বা বেঁটে, ডাকাতের এত ভূতের ভয়, ও লাকখোনিয়া, ও মাকখোনিয়ারে, ভূউউউত, বস্তা ফেলে দে দৌড়, পগারপার।
দারোগা।। ছোড় দিয়া?
হুতুম।। পলায় গেল যে, আমরা তখন বস্তা দুটো এনে হুজুর আসবে বলে অপেক্ষা করছি, হুজুর, আমরা গরিব আদমি, দুই বস্তা কাঁসা আর রূপোর বাসন, সঙ্গে ল-র কড়াই, হামানদিস্তে, পাথরের শিলনোড়া, বহুত ভার…
দারোগা।। সাচ বাত?
ভুতুম।। একদম সাচ, হুজুরের সমুখে মিথ্যে বলব কেন, ও বাবা দারোগাবাবু কপিলমুনির চরন্নে সেবা লাগি, মোয়াদেব।
দারোগা।। এই মধু কী বলে?
মধু।। ঠিক বলে হুজুর, ওরা আর বইতে পাচ্ছে না, আপনি ডাকাতির মাল থানায় নিয়ে যান, ওরা খালি হাতে গান করতি করতি ফিরুক।
দারোগা।। নেহি, থানায় চলুক, পুরস্কার হবে।
মধু।। থানায় কেন এখেনে পুরস্কার দিন হুজুর, বেশি না অল্প, দু-ঘা করে দিন।
ভুতুম।। কেনে পাঁচশো ট্যাকা আর লেডিকেনি, নিমকি বুঁদে?
ঘোতন।। বস্তা দুটো কই?
হুতুম।। তুফানের পিছে।
দারোগা।। বিহাইন্ড দ্য রিকশা, কে ধরেছে, রিকশা না তোরা?
হুতুম।। আমরা।
ঘোতন।। (দূরবিনে চোখ) নেহি, মধু ধরেছে, মধুর কাছে বুদ্ধি ছিল আটকে রেখেছে, এই মধুদা, কে ধরেছে এক বস্তা বাসন আর এক বস্তা কোসন, বুদ্ধু ডাকাত, হামানদিস্তে, শিলনোড়া চুরি করে বইতে নারে।
হুতুম।। না হুজুর আমরা ধরেছি।
ঘোতন।। ক্যাচ কট কট, এখন হাত কামড়া, পা কামড়া, কত পেলাস্টিক বালতি-ঝুড়ি, কৌটোবাটা, কত শখের জামাকাপড়, নিলিনে তো এই নিলি।
হুতুম।। ঠিক বলেছ, ঘোতনদাদা, বুদ্ধি না তো গরুর নাদা, আমরা এখন যাই।
ভুতুম।। পুরস্কার চাইনে, নিমকি-বুঁদে খাইনে।
দারোগা।। এই দুই হুয়ারিউ, বস্তা কাঁধে নে, থানায় দিয়ে ছুটি।
হুতুম।। বড্ড ভার, চাপে আমি আরও বেঁটে হয়ে যাব গো।
দারোগা।। নে বলছি, দুইজনাতে দুই বস্তা, মধুর রিকশা বুঁদে নিমকি, না মধুর জন্য নিমকি বুঁদে, রিকশার জন্য পাঁচশো টাকা, এই দুই ডাকুর একটা বেঁটে একটা লম্বা, কে বলেছিল, সেই বুড়ি জগদম্বা, গেরস্তের দাওয়ায় শুয়েছিল, সারারাত্তির তার ঘুম আসে না, ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে আর ডাকাত দ্যাখে, পাক্কা গুপ্তচর, বুড়ি ঠিক কথাটি বলেছিল।
[হুতুম ভুতুম বস্তা টেনে তোলে কাঁধে। কোঁ কোঁ করে ভারে।]
হুতুম।। কতবার বললাম শিল আর নোড়া, এক্কেরে বাতিল ঘোড়া, নিসনে নিসনে, এখন বোঝ, মধুর রিশকা নিল ডাকাতির মাল?
মধু।। পরেরবার জামাকাপড়, খড়বিচুলি, কাগজটাগজ নিও, চলো চলো, আমার বুঁদের ভাগ তুমরা নিও, দারোগবাবু একা একা নিমকি খাবু না, হুতুম-ভুতুম দুঃখী মানুষ, কিছুই বুঝে না, চ চ।
[হুতুম ভুতুম বস্তা মাথায় চলে। দূরবিনে তাদের দেখতে দেখতে চলে ঘোতন। দারোগা আচমকা বলে]
দারোগা।। ডাইনে মুড়।
[ডাইনে ঘুরতেই মঞ্চের সামনের দিক। দর্শকের দিক।]
দারোগা।। তুফান মেলের ডাকাত ধরা শেষ হল, নিমকি বুঁদে পাওনা রইল, বাঁইয়ে মুড়, লেফট রাইট, স্কচ বাইট, বাসন মাজার কাজ পাবি, সিধা চল।
[সকলে প্যারেড করে চলতে থাকে। পিছনে ভেঁপু বাজতে থাকে।]

ছবিঃ সুমিত রায়

To Top