পৃথিবীতে গান এসেছিল দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

নিস্তব্ধ পৃথিবী। তার বুক জুড়ে শুধু জল আর ন্যাড়া জমি। তার বাতাসে ভাসে শুধুই ঝড়ের শব্দ আর সেই বাতাসকে ঘিরে উপুড় হয়ে জলের দিকে তাকিয়ে থাকে নিস্তব্ধ আকাশ। সেখানে গান ছিল না। সুর ছিল না কোনও। আর তাই, সুরহীন পৃথিবী ঘুমিয়ে ছিল।

সে পৃথিবীকে শাসন করত দুই বন্ধু— কোয়েজাকোটি আর তেকালিপোকা। একজন ঝড়ের ঠাকুর আর অন্যজন আকাশের। দুটিতে মাঝে মধ্যে লড়াই বাধে, আবার মাঝে মধ্যে দিব্যি ভাবসাব।
একদিন তেকালিপোকার মাথায় একটা মতলব এল। তখন তাদের ভাবসাবের সময় চলছে। ডেকে পাঠাল সে তার বন্ধুকে বিরাট এক ফাঁকা মাঠের বুকে। খবর পেয়ে খানিক বাদে হাঁফাতে হাঁফাতে কোয়েজাকোটি এসে হাজির।
“দেরি কেন রে?” তেকালিপোকা রাগ রাগ গলায় বলল।
“আর বলিস না। বেজায় ব্যস্ত ছিলাম। এখন তো ঝড়ের সময়। সমুদ্রের ঢেউগুলোকে ফাঁপিয়ে তুলছিলাম।”
“যে জন্যে ডেকেছি সেটা তোর ওই ঝড়বৃষ্টির চেয়ে বেশি দরকারি।”
“বল দেখি আগে কাজটা কী? তারপর ঠিক করব কোনটা বেশি দরকারি।”
“হুম। আগে কান পেতে একটু শোন দেখি!”
শুনে কোয়জাকোটি খানিক কান পেতে রইল। তারপর বলে, “কই, কী শুনব? কিছুই তো শোনা যাচ্ছে না।”
“ওইটেই তো কথা। পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে যে। কিছু শুনতে পাবি কেমন করে? তাকে জাগাতে হলে গান চাই।”
“গান? সে আবার কী?”
“কিছুই তো জানিস না। গান হল একরকমের শব্দ।”
“শব্দ? সে তো আমিই—”
“আরে থাম।” কোয়জাকোটিকে মাঝপথে থামিয়ে দিল তেকালিপোকা, “ওরকম বিচ্ছিরি গোঁ গোঁ শব্দের কথা কে বলেছে? গান হল গিয়ে বেজায় সুন্দর শব্দ। ওতে সুর থাকে।”
“সুর আবার কী বস্তু?”
“সে তুই না শুনলে বুঝবি কেমন করে? আমি শুনেছি।”
“কোত্থেকে শুনলি?”
“সূর্যের প্রাসাদে। আমি আকাশের দেবতা তো! সূর্য আমার কাছেই থাকে কিনা! সুর এক দারুণ জিনিস বুঝলি? এই যে চারদিকে ঘুমিয়ে থাকা পৃথিবীটা দেখছিস, গানের সুর কানে গেলেই দেখবি কেমন জেগে ওঠে সে।”
“তাই বুঝি? তা সুর জিনিসটা এত ভালোই হবে যদি, তাহলে আমি কখনও সেটা শুনিনি কেন?”
“শুনবি কী করে? গানওয়ালারা সবাই যে সূর্যের বাড়িতে থাকে! সেখানে অনেক সুর। সারাদিন আকাশে ঘুরতে ঘুরতে সে গান শোনে। কিন্তু আর কাউকে সে গানের সুর শুনতে দেয় না।”
“কেন? এ তো ভালো কথা নয়!”
“সে তো নয়ই। তাই তো তোকে আজ ডেকে আনা। শোন বলি। তুই এক কাজ কর। সূর্যের বাড়িতে চলে যা সটান। আর সেখান থেকে সেরা গানবাজনার লোকজনকে পৃথিবীতে ধরে নিয়ে আয়। পৃথিবীর ঘুম ভাঙাতে হবে আমাদের।”
শুনে কোয়জাকোটি আর দাঁড়াল না। বিরাট দুটো ডানা ছড়িয়ে লাফ দিল আকাশে। পৃথিবীজোড়া সাগর পেরিয়ে উড়তে থাকল সাত সমুদ্রপাড়ের এক সাগরবেলার দিকে। সেইখানেই আছে সূর্যের প্রাসাদে যাবার উপায়।
উড়তে উড়তে অবশেষে সেই সাগরবেলার কাছে এসে ডানা মুড়ে সে নেমে এল তার ওপরে। তারপর ঝড়ের শব্দ তুলে ডাক দিল, “শংখ, মৎসকন্যা আর জলদানব— কোথায় তোমরা? আমি ঝড়ের দেবতা তোমাদের ডাকছি। সামনে এসো—”
অমনি সূর্যের তিন সেবক শংখ, মৎস্যকন্যা আর জলদানব এসে প্রণাম করে দাঁড়াল তার সামনে।
“আমি সূর্যের বাড়ি যাব। তোমরা আমার জন্য রাস্তা বানাও।”
“যথা আজ্ঞা।” বলেই তারা তিনজন হু হু করে মাথায় লম্বা হতে শুরু করে দিল। দড়ির মতন সরু হয় আর লম্বা হয় তারা, আর একে অন্যের গায়ে পাক খেয়ে খেয়ে তৈরি করে একটা আকাশছোঁয়া দড়ির সেতু। দেখতে দেখতে আকাশ পেরিয়ে, বাতাস পেরিয়ে দড়ির সেতু্র মাথা হারিয়ে গেল গভীর মহাকাশে সূর্যের শহরের দিকে। কোয়জাকোটি এইবার সেই দড়ির সেতু বাইতে শুরু করল। আস্তে আস্তে পায়ের নীচে ছোটো হয়ে হারিয়ে গেল পৃথিবী। সামনে এগিয়ে এল সূর্যের আলোয় ভরা শহর।

 

********

পৃথিবীতে গান এসেছিল দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

সূর্যের শহরে এসে কোয়জাকোটির সব গুলিয়ে যাবার জোগাড়। ঘিঞ্জি শহর। তার চারপাশে শুধু গলি আর গলি। তার মধ্যে দিয়ে সূর্যের প্রাসাদের রাস্তা খুঁজে পায় সাধ্য কার? এ গলি ও গলি ঘুরে ঘুরে হাতেপায়ে ব্যথা ধরে গেছে তার, এমন সময় হঠাৎ তার কানে একটা অদ্ভুত, অজানা শব্দ এল।
সে ছিল—
ঠান্ডা এবং মিষ্টি
যেন গরমকালের বৃষ্টি
যেন হিরের মতন উজ্জ্বল
যেন নদীর জলের কলকল
“এই তবে বোধ হয় গানের সুর হবে!” মনে মনে ভাবল ঝড়ের ঠাকুর। তারপর সেই গানের সুর ধরে ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে সূর্যের বাড়িতে এসে হাজির হল।
সেখানে সূর্যের বিরাট উঠোনে তখন সুর তুলেছে দুনিয়ার সেরা গানওলা আর বাজনদারের দল। বাঁশিওয়ালারা পরেছে সোনালি জমকালো পোশাক, গাথাগায়কদের পরণে নীল আলখাল্লা আর লাল রঙের কাপড় পরে গান গাইছিল ঘুমপাড়ানি গানওয়ালারা।
হঠাৎ সিংহাসনে বসে থাকা সূর্যের চোখ পড়ল কোয়জাকোটির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে সে চেঁচিয়ে উঠল, “গান থামাও। বদমাশ ঝড়ের ঠাকুরটা এইখানে এসে হাজির হয়েছে। ওর সঙ্গে কেউ কথা কইবে না। ও তোমাদের তাহলে ওর বোবা পৃথিবীতে ধরে নিয়ে যাবে।”
কোয়জাকোটি তাতে দমবার পাত্রই নয়। বিরাট ডানাদুটো ছড়িয়ে দিয়ে সে বলল, “ওহে গানওয়ালারা, ওহে বাজনদারেরা, আমার সঙ্গে চলো।”
কেউ কোনও জবাব দিল না। ঝড়ের দেবতা ফের একবার হেঁকে উঠল গুমগুম শব্দ করে, “গাইয়ে-বাজিয়েরা শোনো, আমি ঝড়ের দেবতা তোমাদের আদেশ দিচ্ছি—”
সূর্যের গাইয়ে-বাজিয়েরা সে কথা শুনবে কেন? সকলেই একেবারে চুপ। এইবার কোয়জাকোটির বেজায় রাগ হয়ে গেল। রাগে দশখানা হয়ে ফটে পড়ল সে একশ তুফানের শক্তি নিয়ে। ধেয়ে এল ক্ষ্যাপা হাওয়া। বাজ ডাকল কড়কড়। সূর্যের উঠোন জুড়ে লাফ দিয়ে উঠল বিদ্যুতের জিভ। তার প্রাসাদকে ঘিরে নেচে উঠল পাগলা হাতির মতন মেঘের দল। ভরদুপুরে রাতের অন্ধকার নেমে এল সেখানে। সূর্যের আলো দেখতে লাগল যেন টিমটিমে একটা তারা।
ভয়ে অস্থির হয়ে সূর্যের গাইয়েরা তখন লাফ দিয়ে এসে উঠল ঝড়ের ঠাকুরের ডানার ওপরে। সঙ্গে সঙ্গেই রাগ কমে গেল কোয়জাকোটির। ঝড়বৃষ্টি মিলিয়ে গেল ঠিক যেন এক জাদুর খেলার মতন। গাইয়ে-বাজিয়েদের কোলে নিয়ে কোয়জাকোটি প্রকাণ্ড ডানার ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে গেল সূর্যের প্রাসাদ ছেড়ে। কেউ তাকে আটকাবার সাহসই পেল না!
গানওয়ালাদের কোলে করে নিয়ে এইবার সেতু বেয়ে পৃথিবীর মাটির দিকে নেমে আসতে লাগল ঝড়ের ঠাকুর কোয়জাকোটি। যত সে মাটির কাছে আসছিল ততই, ঘুমিয়ে থাকা পৃথিবী টের পাচ্ছিল, কিছু একটা ঘটতে চলেছে এইবার। স্বপ্নের মধ্যে যার যে ইচ্ছেটা তার ঘুমিয়ে ছিল, তা যেন এইবার সফল হতে চলেছে—
কোয়জাকোটি যত মাটির কাছাকাছি আসছিল ততই পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাচ্ছিল তার লাখো বছরের ঘুম। হাজারো ফুলের রামধনু ফুটে উঠছিল তার শরীর জুড়ে। গাছদের ন্যাড়া ডালগুলো নুয়ে পড়ছিল রঙিন ফলের ভারে। যেন দীর্ঘ ঘুমের পর জেগে উঠছিল পৃথিবী।
অবশেষে কোয়জাকোটি নেমে এল পৃথিবীর নিঃশব্দ মাটিতে। গানওয়ালারা তার কোল থেকে নেমে এসে নিঃশব্দ পৃথিবীকে অবাক হয়ে দেখল খানিক। তারপরে তারা বাজাতে শুরু করল—
বন, পাহাড়, অরণ্য আর মরুভূমির মধ্যে দিয়ে ঘুরে ঘুরে সুর তুলে এগিয়ে চলল তারা। এগিয়ে চলল পর্বতের কন্দর দিয়ে, মহাসাগরের অতল দিয়ে, আর আকাশ বাতাস ভরিয়ে তুলল তাদের সুরের মায়ায়।
তারপর আর কী? খুব শিগগিরই সব মানুষ গান গাইতে শিখে ফেলল। গান গাইতে শিখে ফেলল পাখি আর গাছ, নদী আর মাছ, আকাশ বাতাস, মাটি আর ঘাস, আর পৃথিবীর বাসিন্দা আরও সব্বাই।
তখন পৃথিবীর আকাশে বাতাসে সারা দিনরাত শুধু সুরের বন্যা বয়ে চলল। খুশি হল আকাশ, খুশি হল বাতাস।
সূর্যের সেই গানওয়ালারা পৃথিবীর বুকেই তাদের ঘর বাঁধল। আজও তারা এইখানেই আছে। আজও তাই পৃথিবীর আকাশে বাতাসে, প্রতি ঘাসে ঘাসে সুরের বন্যা বয়। তাই তো পৃথিবীটা এত সুন্দর।

(আজটেকদের লোকগল্প)

ছবিঃ মৌসুমী

To Top