প্রখ্যাত গণিতবিদ এবং দার্শনিক বারট্র্যান্ড রাসেল একবার মজা করে বলেছিলেন যে, মানব সভ্যতায় প্রাচীন ভারতের অবদান একেবারে শূন্য। আক্ষরিকভাবেই শূন্য। কারণ আমাদের আধুনিক দশমিক পদ্ধতিতে সংখ্যা লেখার পেছনে যে ‘সংখ্যা’র ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেই শূন্য ভারতেই আবিষ্কার হয়েছিল।

এই কথাটা অবশ্য আমরা স্কুলের বইতেই পড়েছি। কিন্তু যে কথাটা সাধারণত স্কুলের বইতে লেখা থাকে না সেটা হল এই শূন্যের আবিষ্কার বলতে ঠিক কী বোঝায়? শূন্যকে প্রাচীন ভারতে কেমন করে লেখা হত? শূন্যের সবচেয়ে পুরোনো নমুনা কোথায় পাওয়া গেছে? সেটা কত পুরোনো? আমরা আজকাল শূন্যকে একটা ছোট গোল চিহ্ন দিয়ে বোঝাই। তখন কেমন করে শূন্য লেখা হত?
দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তর খানিকটা সহজ। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে নবম শতাব্দীর একটা মন্দিরের দেওয়ালের একটা ফলক থেকে। এবং উত্তরটা খুবই আশ্চর্যজনক। তখনও শূন্যকে একটা গোল চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হত, ঠিক যেমন আমরা আজকাল করি। এই ব্যাপারটা আরেক বার প্রমাণ করে দেয় যে শূন্য নিয়ে ভাবনা চিন্তা ভারতেই শুরু হয়েছিল। এবং এখান থেকে প্রথমে আরবে, তারপর ১২০০ সাল নাগাদ ইউরোপে পৌঁছয়।
গোয়ালিয়রের মন্দিরের কথায় যাওয়ার আগে আমরা একবার শূন্যের তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করি। দশমিক পদ্ধতি ধরে সংখ্যা লেখার রেওয়াজ শুরু হওয়ার আগে যেসব নিয়ম ছিল তার সাহায্যে খুব বড় সংখ্যা লেখা সহজ ছিল না। যেমন ধরা যাক, রোমান পদ্ধতি। এতে এক (১) বোঝাতে I, পাঁচ বোঝাতে V, দশ বোঝাতে X, পঞ্চাশের জন্য L ইত্যাদি অক্ষর ব্যবহার করা হত। তাই একটা বড় সংখ্যা, যেমন তিয়াত্তর (৭৩) বোঝাতে অনেক জায়গা লাগত – LXXIII, এতে মোট ছটা অক্ষর লাগত। কিন্তু দশমিক পদ্ধতিতে আমরা খুব সংক্ষেপেই একে লিখতে পারি। এই পদ্ধতিতে সংখ্যা জগতের
এক থেকে দশ, দশ থেকে একশ, এমন ভাগে ভাগ করে নিই আমরা। কিন্তু এই পদ্ধতিতে এক আর দশের মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে একটা চিহ্নের দরকার হয়। ‘শূন্য’ হল সেই চিহ্ন। এই চিহ্ন না থাকলে ১১ এবং ১০১ –এর মধ্যে পার্থক্য বোঝানো যেত না।

 

zero-babylon

ব্যাবিলনে ‘শূন্য’ এই ভাবে লেখা হত

তবে সংখ্যাগুলোকে শুধু যে দশক-শতক এইভাবে ভাগ করা যায়, তা নয়। প্রাচীন ব্যাবিলনে ষাট-এর হিসেবে সংখ্যা গণনার একটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হত। এক থেকে ষাট, তারপর একষট্টি থেকে তিন হাজার ছশো (৬০ X ৬০), এই ভাবে ভাগ করা হত। সংখ্যাগুলো লেখাও হত সেই রকম। সেই পদ্ধতিতেও শূন্যের জন্য একটা চিহ্নের দরকার হত। সেই চিহ্ন হিসেবে ব্যাবিলনে প্রথম দিকে একটা খালি জায়গা রেখে দেওয়া হত। কিন্তু এর ফলে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি হত। তাই পরে (আনুমানিক ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে) এর জায়গায় একটা বিশেষ দাগ দেওয়া শুরু হয়েছিল। (এই ষাট-এর হিসেবের অনুরণন আমাদের আধুনিক সময় গণনার পদ্ধতিতে রয়ে গেছে। সেই জন্য আমরা এক ঘণ্টাকে ষাট মিনিটে এবং এক মিনিটকে ষাট সেকেন্ডে ভাগ করি।)

এরপর গ্রীসে যখন গণিত-জ্যামিতির চর্চা শুরু হল, তখন সেখানে শূন্যের জায়গায় একটা গোল চিহ্ন ব্যবহার করা হত। ১৩০ খ্রিষ্টাব্দে টলেমির লেখা একটা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বইতে এই চিহ্নটা ব্যবহার করা হয়েছিল। এমন একটা চিহ্ন কেন ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কয়েকজন বলেছেন যে, বালির উপর মুদ্রা রেখে যখন যোগ বিয়োগ করা হয়, তখন কোনও মুদ্রা সরিয়ে নিলে বালির উপর সেই জায়গায় একটা গোল দাগ থেকে যায়, সেটাই শূন্যের চিহ্ন। কারণ সেটা কোনও কিছুর অনুপস্থিতিকে, বা শূন্যতা বোঝায়। কিন্তু এই ব্যাখ্যাটা তেমন জোরালো নয়। তাই এ নিয়ে কোনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো যায়নি।
এর পর ৫০০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের আর্যভট্ট সংখ্যা গণনার একটা নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তিনি তাঁর বইয়ে গণিতের কথা শ্লোকের মাধ্যমে বলতে চাইছিলেন। তাই একটা বিশাল সংখ্যাকে কীভাবে সংক্ষেপে লেখা যেতে পারে, তার জন্য একটা সংকেত, বা ‘কোড’ বানিয়েছিলেন। এতে দশক শতক ইত্যাদির জন্য বিভিন্ন অক্ষর নির্দিষ্ট করা ছিল। সেখানে শূন্যের জন্য তিনি ‘খ’ অক্ষরটি ব্যবহার করেন। হয়তো তাঁর মাথায় শূন্যের সঙ্গে মহাকাশ, বা খগোল-এর কোনও সম্পর্কের কথা মনে হয়েছিল, তাই।
তবে গণিতে শূন্যের তাৎপর্য শুধু একক দশকের পার্থক্য বোঝানোর মধ্যে সীমিত নয়। সংখ্যা বোঝানোর জন্য দরকারি এই বিশেষ চিহ্নটা যে নিজেও একটা সংখ্যা, সেটা আরও পরে বোধগম্য হয়েছিল। কারণ অন্য সংখ্যার মতো প্রকৃতিতে শূন্যের উদাহরণ পাওয়া মুশকিল। যখন আমরা দুটো পাখি, দুটো গাছ বা দুজন মানুষ দেখি, তখন এই সবগুলো জিনিসের মধ্যে একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাই। সেটা হল জিনিসগুলোর দ্বিত্ব। এই সবগুলোই এক জোড়া। সবগুলোর মধ্যে আছে ‘দুই’-এর বিশেষত্ব। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে ‘দুই’-কে একটা সংখ্যা বলে ভাবার চিন্তার উৎস। বাকি সব সংখ্যার উৎসও একই রকম। সব সংখ্যার পিছনে রয়েছে প্রকৃতি। কিন্তু শূন্যকে সংখ্যা বলে ভাবার কোনও প্রয়োজন নেই। কোথাও একটা পাখি নেই বা একটা গাছ নেই। নেই তো নেই, কিন্তু তা বলে এই না থাকার মধ্যে আমরা চট করে শূন্যতাকে আলাদা করে খুঁজে পাই না।
তাই শূন্যকে আলাদাভাবে একটা সংখ্যা হিসেবে ভাবতে অনেক সময় লেগেছে। ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে ব্রহ্মগুপ্ত একটা বই লিখেছিলেন, যার নাম ছিল ব্রহ্মস্ফূট সিদ্ধান্ত, এই বইতেই তিনি প্রথম শূন্যকে একটা সংখ্যার মর্যাদা দিয়েছিলেন। এটাকেই প্রকৃত অর্থে শূন্যের আবিষ্কার বলা যতে পারে।
অনেকে বলেন গুপ্তযুগে বৌদ্ধ দর্শনে এক সময় ‘শূন্যতা’ নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু হয়; হয়তো তার সঙ্গে শূন্য আবিষ্কারের একটা যোগাযোগ রয়েছে। নাগার্জুন নামে এক বৌদ্ধ দার্শনিক এই নিয়ে চিন্তা করেছিলেন। বিশ্বের এবং জীবনের সবকিছুর মধ্যে যে একটা শূন্যতা নিহিত আছে, এর উপলব্ধিই একজনকে নির্বাণ লাভের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এই হল এই মতবাদের মূল কথা। এর থেকেই এক সময় ‘জেন’ (ZEN) দর্শনের সূত্রপাত হয়, কারণ এই শূন্যতার উপলব্ধির একটা উপায় ছিল ধ্যান করা। এবং ‘ধ্যান’ শব্দটা থেকে ‘জেন’–এর উদ্ভব।
কিন্তু আর্যভট্ট বা তার পরবর্তীকালে ব্রহ্মগুপ্ত, এঁদের কারোর সঙ্গে যে কোনও বৌদ্ধ বিহার বা শিক্ষা কেন্দ্রের যোগাযোগ ছিল, তার কোনও প্রমাণ নেই। অবশ্য এও বলা যায় না যে কোনও যোগাযোগ ছিল না। ব্রহ্মগুপ্তের জন্ম হয়েছিল ভারতের পশ্চিমে। তখনকার দিনে নিজের বইয়ে একটা সংক্ষিপ্ত ‘লেখক পরিচিতি’ দেওয়ার একটা প্রথা ছিল, সেই থেকেই ব্রহ্মগুপ্তের কোন সালে এবং কোথায় জন্ম হয়েছিল, এই সব তথ্য জানা যায়। সেখানেও বৌদ্ধদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগের উল্লেখ নেই।
তবে এই কথাও উল্লেখযোগ্য যে ব্রহ্মগুপ্ত যখন তাঁর বই লিখেছিলেন, সেই সময় বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এসেছিলেন। হিউয়েন সাং যে বিশেষ বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, বা পরে বইও লিখেছিলেন, সেটার ভিত্তিও ছিল এই শূন্যতা। কে জানে এই ঘটনাগুলো কাকতালীয় কিনা, অথবা এদের মধ্যে কোনও কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে কিনা।
সে যাই হোক, আমরা শূন্যের তাৎপর্যের কথায় ফিরে যাই। সংখ্যা হিসেবে শূন্যের সংজ্ঞা দেওয়া যে কত কঠিন কাজ ছিল, সেটা ব্রহ্মগুপ্তের লেখা পড়লেই বোঝা যায়।
প্রথমে তিনি বললেন, কোনও ধনাত্মক বা ঋণাত্মক সংখ্যার সঙ্গে শূন্য যোগ দিলে সেই সংখ্যা বদলায় না। শূন্যের সঙ্গে শূন্য যোগ দিলে তার ফল হয় শূন্য।
বিয়োগের ব্যাপারটা তত সহজ নয়। দেখা যাক তিনি এর পরে কী বলেছিলেন। শূন্য থেকে কোনও ঋণাত্মক সংখ্যা বিয়োগ করলে তার ফল হয় ধনাত্মক। শূন্য থেকে কোনও ধনাত্মক সংখ্যা বিয়োগ করলে ফল ফয় ঋণাত্মক। কোনও সংখ্যা থেকে শূন্য বিয়োগ দিলে সেটা বদলায় না। শূন্য থেকে শূন্য বিয়োগ দিলে ফল হয় শূন্য।
এর পর তিনি লিখলেন যে, কোনও সংখ্যার সঙ্গে শূন্য গুণ দিলে তার ফল হয় শূন্য। এত সংক্ষেপে শূন্যের বৈশিষ্ট্যগুলো একের পর এক লিপিবদ্ধ করা সত্যি প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু এর পর শূন্য দিয়ে ভাগ করা নিয়ে ব্রহ্মগুপ্ত খুব চিন্তায় পড়েছিলেন। তিনি বললেন, কোনও সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে তার ফল হয় একটা ভগ্নাংশ, যার হর (denominator) হল শূন্য। শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে ফল হয় শূন্য।

 

gwalior0

গোয়ালিয়রে চতুর্ভুজের মন্দির

এই শেষ পর্যায়ে এসে ব্রহ্মগুপ্তের কথা ধোঁয়াশাযুক্ত মনে হয়। কোনও সংখ্যা, ধরা যাক x-কে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে যে আমরা x/0 পাব, এতে কিছুই খোলসা করে বলা হল না। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এই পর্যন্ত এসে ব্রহ্মগুপ্ত দম হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু তিনি যে এতটুকুও বলতে পেরেছিলেন, এতেই তাঁর নাম শূন্যের আবিষ্কারের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে।
ব্রহ্মগুপ্তের প্রায় পাঁচশ বছর পর আরেকজন বিখ্যাত গণিতবিদ ভাষ্করাচার্য শূন্য দিয়ে ভাগ করা নিয়ে আবার ভাবতে শুরু করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, শূন্য দিয়ে কোনও সংখ্যা ভাগ করলে তার ফল হয় অসংখ্য, বা ইনফিনিটি। এটাও ঠিক সত্যি নয়। আসলে শূন্য দিয়ে ভাগ করাটা গণিতের ভাষায় সংজ্ঞাহীন বা নিরর্থক, এর কোনও নির্দিষ্ট ফল নেই।
তবে ওইটুকু অংশ নিয়ে ইতস্তত করলেও ব্রহ্মগুপ্তের সংজ্ঞা যে গণিতের গবেষণার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর ফলে ঋণাত্মক সংখ্যা নিয়ে অঙ্ক করা শুরু হল ব্রহ্মগুপ্তের হাত ধরেই। গণিতকে তিনি একটা বস্তু নিরপেক্ষ বা অ্যাবস্ট্রাক্ট স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগটা খুব ক্ষীণ। শূন্যতার চিন্তা থেকে শূন্যকে সংখ্যা হিসেবে ভাবা ছিল অ্যাবস্ট্রাক্ট-এর দিকে উত্তরণের প্রথম ধাপ। বলা যায় শূন্যের আবিষ্কার দিয়েই আধুনিক গণিতের সূত্রপাত হয়েছিল।
কিন্তু এটা তো গেল শূন্যের সংজ্ঞার কথা। ব্রহ্মগুপ্তের বইতে শূন্যের কথা আছে ঠিক, কিন্তু তখনকার দিনের কোনও লেখা তো এখন আর বর্তমান নেই। ইতিহাসবিদরা সবসময় প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ খোঁজেন, কারণ এই ধরনের প্রমাণই একমাত্র প্রত্যক্ষ প্রমাণ। এখনও পর্যন্ত ভারতে শূন্যের ব্যবহারের সবচেয়ে পুরোনো নিদর্শন পাওয়া গেছে মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে একটা মন্দিরে। সেখানে একটা নামকরা দুর্গ আছে। গোয়ালিয়রে গেলে সবাই সেখানেই বেড়াতে যায়। এর একটা কারণ হল, ওই জায়গাতেই ঝাঁসির রানির সঙ্গে ব্রিটিশদের শেষ যুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু তার কাছে একটা ছোট মন্দির আছে, যার তেমন নামডাক নেই, যদিও গণিতের ইতিহাসে এর তাৎপর্য অনেক।
মন্দিরটি চতুর্ভুজের অর্থাৎ বিষ্ণুর। মন্দিরের বিগ্রহের চারটে হাত আছে, কিন্তু কোনও মুখ নেই। এক সময় নিশ্চয়ই ছিল, কেউ বা কারা হয়তো ভেঙে দিয়েছে। মন্দিরে দুই জায়গায় প্রাচীন লিপি আছে। একটা বাইরের দরজার উপরে উৎকীর্ণ। আরেকটা হল গর্ভগৃহের বাঁ দিকের দেওয়ালে (মন্দিরের বিগ্রহের ডানদিকে) আটকানো একটা ফলকে খোদিত করা। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে প্রত্নতাত্তিকরা যখন মন্দিরটা নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু করেন, ততদিনে সেটা ভগ্নদশায় পৌঁছেছিল। প্রথমে তো বাইরের দরজার উপর দিককার লিপিটা কেউ লক্ষই করেনি। তারপর ১৮৮৩ সালে ইউজিন জুলিয়াস হুলৎশ (Hultsch) নামে এক বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এই লিপি আবিষ্কার করেন এবং ইংরিজিতে অনুবাদ করেন। তাতে ২৭টা শ্লোকে যা লেখা আছে তার ভাষাশৈলী দেখে তিনি চমৎকৃত হয়েছিলেন।

 

gwalior1

গোয়ালিয়রে চতুর্ভূজের মন্দিরে ‘২৭০’ বা ‘২১০’ সংখ্যা লেখা রয়েছে

তিনি এই লিপির গর্ভগৃহের কাছের লিপিটিও অনুবাদ করেন। কিন্তু হুলৎশ সাহেব এই লেখা নিয়ে ততটা উত্তেজিত হননি। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, এই ফলকে যা লেখা আছে তার ব্যাকরণই ভুল। তাই তিনি একে পাত্তাই দেননি। ভাগ্যের পরিহাস এই যে, এটাই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলকটাতে যা লেখা আছে সেটা মোটামুটি এই রকম –

৯৩৩ সালের মাঘ মাসে শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয় দিনে… স্থানীয় অঞ্চলের সবাই মন্দিরে দান করেছিল… মন্দিরটা ভৈলভট্টের পুত্র অল্ল নির্মাণ করেছিলেন সেই জমির উপর, যার দৈর্ঘ্য ২৭০ (মতান্তরে ২১০) হস্ত এবং প্রস্থ ১৮৭ হস্ত… এই অঞ্চলের বাসিন্দারা মন্দিরে প্রতিদিন ৫০টা ফুলের মালা দান করার বন্দোবস্ত করেছে…
সেই সময় এই অঞ্চলে সাল গণনা শুরু হয়েছিল ৫৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। তাই ৯৩৩ সাল আসলে আমাদের হিসাবে দাঁড়াবে ৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দ। এই বর্ণনায় দুই জায়গায় শূন্যের দরকার হয়েছে। একবার ‘২৭০’ বা ‘২১০’ হস্ত দৈর্ঘ্যের কথা বলতে গিয়ে আর একবার ৫০টা ফুলের মালার প্রসঙ্গে। দুই জায়গাতে শূন্যের জন্য একটা ছোট গোলাকার চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে এইটাই হল শূন্যকে লিপিবদ্ধ করার সবচেয়ে প্রাচীনতম নিদর্শন। শুধু ভারতেই নয়, সমস্ত পৃথিবীতে।
এই লিপিতে আর একটা ব্যাপারও খুব চমৎপ্রদ। অন্যান্য সংখ্যা যেভাবে লেখা হয়েছে, তার সঙ্গে বর্তমান লিপির অনেক মিল দেখা যায়। যেমন যেভাবে ১, ২, ৩ ইত্যাদি লেখা হয়েছে, বোঝা যায় যে এখন যে ভাবে উত্তর ভারতে সংখ্যা লেখা হয়, সেই প্রথা এক হাজার বছরের পুরোনো।
এই লিপি কী তাহলে প্রমাণ করে দেয় যে শূন্য ভারতেই আবিস্কৃত হয়েছিল? অনেক ইতিহাসবিদ এখনও এই বিষয়ে একমত নন। তাঁরা বলছেন যে নবম শতাব্দীতে আরবের ব্যবসায়ীরা ভারতে আসা-যাওয়া করতে শুরু করেছিল। কে জানে ওরাই ভারতে শূন্য লেখার পদ্ধতি নিয়ে এসেছিল কিনা। তাঁদের মতে আরও পুরোনো কোনও নিদর্শন না পেলে এই কথা প্রমাণ করা যাচ্ছে না যে, ভারত থেকেই আরবে এবং পরে ইউরোপে শূন্য লেখার প্রথা গিয়েছিল।

 

gwalior2

গোয়ালিয়রের বিষ্ণু মন্দিরে যেভাবে ৯৩৩ সংখ্যাটা লেখা হয়েছে, তার সঙ্গে আধুনিক লিপির অনেক মিল রয়েছে।

বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ আমির আকজেল (Amir Aczel) সম্প্রতি তাঁর বই Finding Zero–তে আবার এই প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ভারতে এসে গোয়ালিয়রের মন্দিরে শূন্যের লিপি দেখার পর চলে গেছেন কম্বোডিয়ায়। সেখানে আঙ্কোর ভাট থেকে চার মাইল দূরে এক জঙ্গলে খুঁজে পেয়েছেন ৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দের একটি লিপি, যেখানে শূন্যকে একটা বিন্দু দিয়ে বোঝানো হয়েছে। তাঁর মতে সেটাই হল শূন্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। সত্যি কি তাই? অবশ্য আঙ্কোর ভাটের সঙ্গে ভারতীয় সভ্যতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। তাই সেখানে শূন্যকে লিপিবদ্ধ করার উৎস ভারতে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু যে প্রশ্নটা থেকে যায়, সেটা হল এই, দুশো বছরের মধ্যে শূন্য লেখার পদ্ধতি একটা বিন্দু থেকে গোল চিহ্নে রূপান্তরিত হল কীভাবে? এবং কেন? এই নিয়ে এখনও গবেষণা এবং বিতর্ক চলছে। ভবিষ্যতেও চলবে। কে জানে, তোমরা যারা এই লেখাটা পড়ছ, হয়তো তাদের মধ্যে কেউ এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর খুঁজে বার করবে একদিন।

ছবিঃ লেখক

To Top