বদনচাঁদের বদান্যতা মিমি রাধাকৃষ্ণান

বৈশাখের অসহ্য গরমে মস্ত ছাদের এ মাথা ও মাথা পায়চারি করতে করতে অকস্মাৎ বদনচাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল শ্রীমতী বেণুবীণা দত্ত ওরফে বাচ্চু রায়ের।
ঘটনাটা বলতে অবশ্য যতটা সহজ অর্থাৎ একবাক্যেই সমাপ্ত, কার্যত কিন্তু তা মোটেই নয়। অতি দুরূহ ব্যাপার। মেলা কারিকুরি আর চূড়ান্ত প্যাঁচালো ধূর্তামির একেবারে একশেষ না হলে পরে এমনটি অসম্ভব। তার প্রথম কারণ হল, শামশিপুরের বড় তরফের খাসমহল এই চামেলীকুঞ্জ সাধারণের যাতায়াতের আওতা, মানে আমলাবাড়ি, খাজাঞ্চিখানা, বার দেউড়ি, পিছদুয়ারি ইত্যাদি ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন নামের ব্যবহারযোগ্য এলাকা থেকে বেশ খানিকটা নিরাপদ দূরত্বে। তায় তার ছাদে যাবার সিঁড়ি উঠেছে অন্দরের মাঝ বরাবর। সেই প্রাইভেট ছাদে আবার বাড়ির গণ্যিমান্যি লেডিজের নিরিবিলি একাকী সান্ধ্যভ্রমণ। তা, সে সময় এমন ধারা অচেনা, অজানা উটকো মানুষের আচমকা আগমনকে একেবারে দেড়শ বছরের সম্পূর্ণ নিয়ম লঙ্ঘনকারী বেআইনি অনাচার ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়? কিছুই না। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে নেহাত কোনও দুর্ঘটনা ব্যতীত এহেন ঘটনা ঘটা, সম্পূর্ণ দুর্ঘটনারই সামিল। সুতরাং এমন অবস্থায় যে কোনও একাকী মহিলারই প্রাণভয়ে, প্রাণপণে ‘কে কে’ করে গলা চিরে আর্তনাদ করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এমন মাথাভরা নানান এলোমেলো চিন্তায় এমনই জর্জরিত তিনি, যে অত্যাশ্চর্য এই ঘটনায় বিচলিত হওয়া তো দূরের কথা, তাঁর মধ্যে সামান্যতম বিকারও লক্ষ করা গেল না মোটে।
এমনিতেই স্বভাবসিদ্ধ ভয়ানক আলাভোলা, এলোমেলো মানুষ তিনি। এটা হারাচ্ছেন, ওটা ভুলছেন, সেটা খুঁজছেন… তায় শতেক কাজের বোঝা ঘাড়ে চাপিয়ে সেসব সামলাতেই ব্যতিব্যস্ত, বেসামাল একেবারে, ফলে এমনটাই তো হবার কথা।
বছর ছয়েক আগে নিয়ম মতন কর্মক্ষেত্র থেকে অবসর নিয়ে ডজনখানেক সমাজসেবামূলক কাজে এমনই জড়িয়ে ফেলেছেন নিজেকে। দুটি এনিম্যাল শেল্টারের অংশীদার, বৃক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের কর্মকর্তা, বৃক্ষরোপণ সংস্থার সক্রিয় সদস্য, এছাড়া ‘জলই জীবন’, ‘বসুন্ধরা’, ‘ধুম্র নিবারণী সমিতি’ ইত্যাদি আরও গোটা আটেক প্রকল্পের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা মেলা, পরব পার্বণ যেমন থাকে শীতকালের অপেক্ষায় — এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র কিন্তু ঠিক তার উলটো। এনাদের সূচনা হয় গ্রীষ্মের শুরু থেকে। স্কুল কলেজ ছুটি, পরীক্ষা শেষ… ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করবার সেইটিই উপযুক্ত সময়। ফলে, হাজার কাজের চাপে যখন ভাবছেন দম ফেলবার সময়টুকু কোনওমতে বাঁচিয়ে ফেলতে পারলে কাজ আর কতখানি এগোনো যেতে পারে, সে সময় এই শামশিপুরের বড় তরফ থেকে ছোটকাকাবাবুর তলব — ‘আর্জেন্ট ডিসকাসন, কাম শার্প’।
টেলিগ্রামের দিন গেলেও পুরোনো মানুষটি এখনও অতি প্রয়োজনে এস এম এস করেন ওই ভাষাতেই। এবং অতিশয় প্রয়োজন বিনা সেটিও কদাচ নয়। কিন্তু এই বার্তা পেয়ে তো বেণুবীণা ওরফে বাচ্চু রায়ের মাথায় হাত। বাবারে! বলে কী! এবার উপায়?
তবে এমন একটা ডাক আসতে পারে, তেমনটার ইশারা ইঙ্গিত পাচ্ছিলেন অবশ্য কিছুদিন থেকে। ভাবছিলেন হাত খালি হলেই এবার করতে হবে কিছু, নেহাত ওই খালি আর হচ্ছিল না, এই যা। তা সে খালি হাত করিয়ে ছাড়লেন কাকাবাবু স্বয়ং। ব্যাপারটা হল এই, শামশিপুরের বড় তরফের রায়দের কিংবদন্তী সেই জমিদারি খেতাব এখন বেহাত হয়ে গেলেও, জমিজমা আছে যথাস্থানেই। আর আজকাল এক লপ্তে এই বিশাল সম্পত্তি সামলানো মানে, এক কথায় যাকে বলে অসম্ভব। ফলে কিছু বছর আগে বসতবাড়ির লাগোয়া বেশ খানিক বাস্তু জমিজিরেত ছোটখাটো ভাগে বিভক্ত করে অংশীদারদের নামে নামে বিলিয়ে, মাথার বোঝা তখনকার মতন খানিক লাঘব করার চেষ্টা হয়েছিল। তা বাদে খাসমহল চামেলীকুঞ্জ আয়তনে সে যত বিশালই হোক না কেন, গত একশ বছরে তার লোকসংখ্যাও তো মন্দ বাড়েনি। ফলে সব তুতো ভাইবোনেরা ঘর বানিয়ে বাগান সাজিয়ে পুকুর কাটিয়ে এখন দিব্যি আছেন তারা। সবার মধ্যে থেকেও বেশ নিজের মতন বাস। কারোর দারোয়ান আছে, কারোর বা মালি, কেউ কেয়ারটেকার রেখেছেন দেখাশুনার জন্য। পালা-পার্বণ ছাড়াও বছরে আরও দু-চারবার… কেউ আবার অবসর নিয়ে এখানেই বসবাস করছেন মৌরসিপাট্টা জমিয়ে… বাদ কেবল আমাদের বাচ্চু রায়। তার ভাগ্যে পড়েছে খাজাঞ্চিখানার পুবে প্রাচীন আম জাম বকুল গাছে ছাওয়া বড় ইঁদারা আর ছাদ খোলা পাঁচিল ঘেরা মেয়েদের সেকালের নাইবার জায়গা সমেত পুরোনো পাকশালার সংলগ্ন মোট এক বিঘে জমি। ভাগে পড়েছে বটে… তবে সে পড়েই আছে যেমনকে তেমন, তাঁর আর সময়ই হয় না মোটে।
প্রথম বছর তিনেক অত কেউ গা করেনি, সময় দেওয়া হয়েছিল ভাবনাচিন্তার জন্য। তারপর বিশেষ সুযোগ, আরও তিন বছর এক্সটেনশন। সে সময়টাও পেরিয়ে যেতে গুরুজনদের থেকে সামান্য ধমক ধামক পড়াতে, লোক ডেকে মাপ জোপ করালেন। পয়সার শ্রাদ্ধ করে বার কতক নক্সা-টক্সা বানালেন খানিক। তার দ্বিগুণ নক্সা বাতিল হল। তারপর আবার যে কে সেই। গত দু বছর থেকে শোনাচ্ছেন, ও জমির পুরোনো দালান ভেঙে কী নাকি একতলা ঘর তুলে বৃদ্ধাশ্রম করবেন। পরিবারের বুড়োবুড়িরা থাকবেন সেখেনে শেষ জীবনে মনের আনন্দে। তা যাদের কথা মাথায় রেখে এ বক্তব্য, তাঁরা এতদিনে সবাই প্রায় স্বর্গবাসী, তবু টনক নড়ে না। ওদিকে গুরুজন বলতে বাবা-জ্যাঠারা গত হয়ে তলানিতে এসে ঠেকেছেন এখন সবেধন নীলমনি ছোটকাকা। কিন্তু ওই তলানিই প্রয়োজনে উপচে ওঠে ঘড়ার কানা পর্যন্ত। অতঃপর তাঁর ধৈর্যের বাঁধ গেল ভেঙে, “ইয়ার্কী! তুমি ওদিকে দেশোদ্ধার করবে, আর এখানে বাপ ঠাকুদ্দার উঠোনে চরবে ঘুঘু? আগে রাত বিরেতে ওদিক পানে শোনা যায় লোকজন ঘোরাঘুরি করত, আজকাল ভর দুপুরেও নাকি খুটুর খাটুর শব্দ হয়। এ চৌহদ্দিতে এমনতরো সাহস কারোর হয়নি। এখন সুযোগ বুঝে তাও হচ্ছে।” ফলে খই ভাজা বন্ধ রাখিয়ে ভাইঝিকে শামশিপুরে তলব পাঠিয়ে ডেকে এনে একেবারে নজরবন্দী করে রেখেছেন ছোটকাকা। এমনিতেই ভাইঝির এ বয়সে ওসব হুজুগ নিয়ে মাতামাতি বরদাস্ত করছিলেন না মোটে। তায় নিজের দায়িত্বে গাফিলতি? ও জমির সৎকার না করে এবার চামেলীকুঞ্জের বাইরে পা-ও রাখতে পারবে না শ্রীমতী বেণুবীণা ওরফে বাচ্চু রায়। এবং যেহেতু সাবেক বাড়ির রেওয়াজ মেনে গুরুজনদের শ্রদ্ধাভক্তি যা-ই করুক না কেন, ভয়টা করে সব চাইতে বেশি, সেহেতু ঘাড় নেড়ে সেই যে ঘরে ঢুকেছেন, সেখানেই ঘুরঘুর করেছেন গত এক হপ্তা রাত্তির দিন। কাকাবাবুর হুকুম, আগামীকাল সকালে ঠিকাদার আসবে, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আর তার সহকারীও থাকবে সঙ্গে। নক্সা নিয়ে সকাল আটটার মধ্যে কাছারি বাড়িতে… ইত্যাদি, শুভস্য শীঘ্রম।
এদিকে তলব পেয়ে উড়ে পুড়ে তিনি তো এসে হাজির, সঙ্গে নক্সা-টক্সা মাপজোকের কাগজপত্তর কিন্তু কিছুই নেই। বানানো হয়েছিল, কিন্তু এখন কোথায় যে গেছে কে জানে! বৃদ্ধাশ্রমের জন্য একবার লম্বা দালান ঘেরা খান কতক ঘরের ডিজাইন হয়েছিল মনে আছে। তারপর সেটি বাতিল করে তিন কামরা সমেত অবসর জীবনের তাঁর বসত বাড়ি। সামনে বারান্দা, পেছনে কী যেন… দুটো বাথরুম, একটা রসুই ঘর, নাকি তার উলটো, এলোমেলো মাথায় কিছুই মনে পড়ছে না। কেবল মনে পড়ছে, কাল আছে কপালে। আপাতত কাল থেকে দালান ভাঙার কাজ তো শুরু করা যাক। ভেঙে ফ্ল্যাট করতে করতে যেমন করে হোক কোনও লোকাল নক্সাদার ডেকে যা হোক কিছু একটা খাড়া করে দিতে হবে। দত্তমশাই কী যে বিরক্ত হবেন, ছেলেমেয়েরা আরও দশগুণ এবং ভাইবোন আত্মীয় স্বজনের মাত্রাটা একশ না দেড়শয় চড়বে এই চিন্তায় মনের দুঃখে পাগল পারা অসহায় শ্রীমতী বেণুবীণা দত্ত ওরফে বাচ্চু রায় সন্ধে রাতের অন্ধকারে একা একা চামেলীকুঞ্জের নির্জন ছাদে পায়চারি করতে লাগলেন এ মাথা থেকে ও মাথা।

###

অন্ধকার মোটামুটি গাঢ় হয়ে ছাদটাকে কেমন যেন সীমাহীন দেখাচ্ছিল। চারিদিকের বড় বড় গাছের মগডালে পাখিরা শেষবারের মতো নড়েচড়ে ঘুমের তোড়জোড়ে ব্যস্ত, বাচ্চু রায় শেষ প্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই অদ্ভুত ‘খুঁক খুঁক’ একটা আওয়াজ পেলেন এবং পরক্ষণেই স্পষ্ট গলা খ্যাঁকরানির সঙ্গে সঙ্গে ‘খুকুরানি দিদিমণি’ নামে সরাসরি তাঁকেই সম্বোধন। বহুযুগের ওপার থেকে তামাদি হওয়া এ নামে তাকে সহসা কে ডাকল ভাবতে গিয়েই দেখলেন, ঝাপসা অন্ধকারে সামান্য তফাতে একটি কৃষ্ণকায় কৃশ অবয়ব। বাচ্চু রায়ের মাথায় যেহেতু ‘কাকাবাবু’ আর ‘বাড়ির প্ল্যান’ ছাড়া আর কিছুই আসছিল না, তাই ভাবলেন নির্ঘাত ঠিকাদার আসাতে তিনিই তলব পাঠিয়েছেন। বললেন, “কটা বাজে? কোথায় কাকাবাবু?” চেহারাটি সর্দি বসা চাপা গলায় জানাল যে, সময়ের হিসেব তারও নেই। আর কে কোথায় আছে, সেও সঠিক জানা নেই তার। তবে প্রয়োজনে নিমেষে জেনে আসতে পারে। সে এসেছে কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিশেষ প্রয়োজনে। বলেই বলল, “গড় হই শ্রী চরণে।”
বাচ্চু রায়ের বোধ হয় সামান্য সম্বিত ফিরে আসছিল তৎসহ অস্বস্তিও। তাই বললেন, “সে না হয় হল, তবে কিছুই না জেনে এখেনে হাজির হলে কেন? ব্যাপারটা কী?”
“বেপার এট্টা আছে এঁজ্ঞে, এট্টা আজ্জি আছেন আপনের তবে। ভশ্যা দিলি পরে নিবিধন কত্তাম, বড় আতামতরে পইরে পরে আপনের তবে আসা গো…”
কীসের ভরসা, আর্জি বা আতান্তর কিছুই বোধগম্য হল না তাঁর। আদতে তাঁর নিজেরই তো বলবার কথা এসব, যা আতান্তরে পড়েছেন তিনি… বললেন, “তা এখেনে কেন? নীচে যাও। আমি যাচ্ছি। কিন্তু তোমায় চিনতে পারছি না ঠিক। নাম কী তোমার?” মনে মনে ভাবলেন, “বোঝো, বারান্দা ভরা লোকের মাঝ দিয়ে উঠে এল সটান ওপরে, কেউ দেখল না। আর আমাকে বলার বেলায় ছাড়া জমিতে চোর ডাকাতের আস্তানা, হ্যানো ত্যানো।” চিন্তাটা শেষও হয়নি, মাথার চিন্তা লুফে নিয়ে লোকটি বলল, সিঁড়ি দিয়ে নাকি আসেনি সে, এদিক দিয়ে সোজা এসেছে এবং নীচে গিয়ে কথা বলা একেবারেই অসম্ভব। কারণ রোদ, আলো, বিজলিবাতি মোটে সয় না তার। তা বাদে মুখ চেনাও অসম্ভব, নাম তার বদনচাঁদ। ছেলের নাম বললে অবশ্য একবারে চিনতে পারবে সবাই, পবন খ্যাপা।
ভয়, ভাবনা, অবিশ্বাস, কৌতূহল ইত্যাদি নানান প্রকার অবস্থার মাঝে বাচ্চু রায়ের এবার নিজের অজান্তেই হাঁ হয়ে গেল মুখটা। পবন মানে গত বছর পুজোর আগে দুম করে যে মরে গেল সবাইকে কাঁদিয়ে? কিন্তু তার বাবা! সে তো প্রায় গত জন্মের কথা। বেশ মনে আছে, বদনা! ছোটবেলায় নিজের নাম বলতে গেলে বলতেন, “ডাক নাম বাচ্চু, ভালো নাম খুকুরানি দিদিমণি রায়।” তা সে নাম তো বদনারই দেওয়া। বললেন, “তুমি বদনচাঁদ? পাগলের প্রলাপ! সে কোনকালে… আমার তখন বছর পাঁচেক বয়স। ফাজলামি করছ?” এ কথায় বদনচাঁদ হাত-টাত কচলে যে উত্তরটি দিল, তাতে তাঁর তৎক্ষণাৎ ভির্মি খেয়ে উলটে পড়ে হার্টফেল করবার কথা ছিল। কিন্তু আদতে সেসব কিছুই হল না। হয়তো অতি পরিচিত পরিবেশে প্রিয় মানুষজনের ক্ষেত্রে জীবিত মৃত, বা ভূত ভবিষ্যতের কোনও তফাতই হয় না বলেই এমন অবাক কাণ্ড। তা যাই হোক, অতঃপর তার নিজের ভাষায় সংক্ষিপ্তসার যা জানাল, তা হল গিয়ে বাচ্চু রায় ঠিকই বলেছেন, অতি লেজ্জ কথা। ওই সময়েই এক কালবোশেখের ঝড়ের দুপুরে পুরোনো পাকশালার পেছন দিকে নারকেল গাছে বাজ পড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অকস্মাৎ মৃত্যু হয় তার। সেই থেকে গত পঞ্চান্ন বছর যাবৎ পরিবার বিচ্ছিন্ন বদনচাঁদের ওই জমিতেই একাকী বসবাস। কারণ কেতার খালি মৌজার মাসুল দিয়া শ্মশান ঘাটে অন্যান্যদের মতো দাহ সৎকার হলেও, তার কিনা অপমিত্তুর, তাই তার মিত্তু হয়েও মিত্তু নেই। জনমে মরণে মনিব বাড়িতে ঠাঁই পাওয়া কি মুখের কথা? পাকশালার জ্বালানী কাঠের আড়তের ধারে টিনের চাল, শান বাঁধানো পাকা মেঝের চৌহদ্দিতে তার রিটায়ার্ড লাইফের নিরালা, নির্ঝঞ্ঝাট কোয়ার্টার। কিন্তু গত মাসখানেক থেকে সেই বাসেই হয়েছে মস্ত ঝঞ্ঝাট। সকাল থেকে মাপ জোক, নক্সা হাতে কন্ট্রাক্টর। একদিন তো জানলা দরজা ইট কাঠের দরদামও করে গেল টাউনের ঠিকাদার। ওই চত্বর ভেঙে ফ্যালাট করে নাকি বাচ্চু রায়ের বাড়ি হবে। এত কালের পাকাপোক্ত সাবেক দালান, সে ঘর গুঁড়িয়ে ফেলা কি উচিত কাজ হবে? আর এ বয়সে এতকালের আস্তানা ছেড়ে বুড়ো মানুষ, সে-ই বা নতুন করে যায় কোথায়? মানুষ এখন মানুষকেই রেয়াত করে না। তো ভূত-প্রেত… ঢিলিয়ে তাড়াবে তার ছায়াটুকুও দেখলে। শেষের দিকে বদনচাঁদের সর্দি বসা গলাখানা কান্নায় বুজে আসছিল। তাই শুনে আবেগপ্রবণ বাচ্চু রায়েরও চোখে জল। আহা রে, সে যে এখনও ওই চত্বরেই বসবাস করে, তা তো টেরটি পায়নি কেউ। কাউকে দেখা না দিয়ে পরিত্যক্ত ভাড়ার ঘরের কো-ও-ন ঘুপচিতে জড়োসড়ো হয়ে এতগুলো বছর কাটিয়েছে বেচারা। হায় রে কতকালের চেনা, মানুষ না হলেও অমানুষ তো নয়! অশরীরী। খুবই অন্যায়। বললেন, “তুমি একদম চিন্তা কোরো না বদনচাঁদ। চোখের আড়ালে নিরিবিলিতে তোমার কোয়ার্টারের ব্যবস্থা আমি করব। বলো কোন এরিয়াটা তোমার পছন্দ?”
এতখানি ভরসা পেয়ে নির্ভয়ে নাক গলা ঝেড়ে বদনচাঁদ জানাল, “ওই পুরোনো পাকশালার পুবে…” অর্থাৎ কিনা যথাস্থানেই এবং সে জমি পড়েছে তাঁরই ভাগে, যা নিয়ে এত ঝামেলা…
বাচ্চু রায় পড়লেন মহা ফাঁপরে, এখন উপায়? এতক্ষণে হাসি ফুটল বদনার মুখে। দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চস্বরে, “উপায় আছে আমার কাছে। ও দালান ভাঙতে দুবোনি। চুন সুরকির গাথনি দোওয়া, পঙ্খের নক্সা তোলা দিয়াল, পাকাপোক্ত ওই সাবেক ঘর গুঁড়িয়ে, আ-পলকা ঠুনকো বাসা তোলা কি ল্যাজ্য কাজ? সে হবেনি…”
আমতা-আমতা করে বাচ্চু রায় বললেন, “হবেনি বললে কি আর হয় বদনচাঁদ? তোমার দুর্দশার কথা খুব বুঝতে পারছি আমি। কিন্তু আমার অবস্থা তুমি বুঝছ না। তোমার থেকেও শতগুণ, যাকে বলে রাহুদশা।”
কথা শেষ না হতেই বদন প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল, “বুঝেছি, খুব বুঝেছি!”
“ছাই বুঝেছ, কাল সকালের মধ্যে কতগুলো লোক আসবে, কত ক্রোশ উজিয়ে, কী করে যে মুখ দেখাই! টাকা পয়সার শ্রাদ্ধ যা হয়েছে, জলের মতো, তার সাথে মান সম্মান স-ব। ও পুরোনো দালান ভাঙতে শুরু না করলে, হাতে সময় পাব কোথায়? নতুন যা হোক কিছু একটা খাড়া করবার জন্য কটা দিন তো চাই? এতগুলো বছর… এত সময় পেয়ে কিচ্ছুটি করলাম না। এখন মরণকালে হরির নাম। আমার আর ভালো লাগে না বদনা। কী যে দুঃখ, নিজের ওপরেই বিতৃষ্ণা… সে তুমি বুঝবে না।”
কথা শেষ না হতেই বদনচাঁদ প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল, “বুঝেছি, খুব বুঝেছি!” বলেই হাত ঘুরিয়ে একটা কাগজ দেখাল। অন্ধকারেও যা জ্বলজ্বল করে। রেডিয়াম দেওয়া বোধ হয়। তা যাই হোক, তাতে বাচ্চু রায় আঁধার রাতেও প-ষ্ট দেখলেন চমৎকার কলোনিয়ান স্টাইলে একটা বাংলো বাড়ির ছবি। বৃটিশ আমলে সাহেবদের রেসিডেন্সি বাংলো যেমনটা হত ধরনটা তেমন। ধাপকাটা চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে কাঠের রেলিং ঘেরা, মাথায় ক্যানোপি ঢাকা প্রশস্ত ম-স্ত বারান্দা। তার শেষে ঘরে ঢোকার দরজা, শার্সি দেওয়া লম্বা লম্বা জানলা। বাদবাকি আরও যা যা দেখলেন মনে হল, আজি হতে শতবর্ষ আগে মেম হয়ে জন্মালে বেশ হোত। অবশ্য আশপাশের বড় বড় গাছপালাগুলো খুবই পরিচিত। আজন্ম চেনা আম, জাম, কাঁঠাল, তেঁতুল, বকুল ইত্যাদি। তৎসহ একপাশে কপিকল সহ বিশাল একটা ইঁদারাও।
কাগজে আঁকা ছবি দেখতে দেখতে এমন মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন বাচ্চু রায় যে, খেয়ালই হয়নি কখন যে তিনি বদনার সঙ্গে সঙ্গে সেই ধাপকাটা সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠতে শুরু করেছেন।
– খুকুরানি দিদিমণির বাড়ি তাহলি পসন্দ হইয়েঞ্চে বলেন?
– এমন কথা বলো না। কার অপছন্দ হবে বল দিকিনি এমন বাড়ি? কিন্তু…
– কিনতুক্‌ কী?
– মানে কার বাড়ি? কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে। ছোটবেলায় জ্যাঠাবাবুদের সঙ্গে গিয়েছিলাম যেন চেঞ্জেও এমনতরো কোনও বাংলোয়… ওই কুয়োতলা, সিঁড়ির ধাপ…
– মনির মইধ্যে চিষ্টা দ্যাকেন দিকি, কুতায় দ্যাঁকা?
বাচ্চু রায় দরজা ঠেলে ঝকঝকে মডার্ন টালি বসানো বড় ঘরে ঢুকলেন, তারপর পাশের দরজা দিয়ে অন্য ঘরে। আবার সে ঘরেরও দরজা খুলে হাল ফ্যাশানের বাথরুম। বাহ্‌। হাজারিবাগ নাকি ম্যাকলাক্সিগঞ্জ? পাহাড়ে নয়। ওদিকে বারান্দা আছে? আর খানসসামার ঘর? তা-হ-লে…
– আছে, সব আছে। তবে সে আপনের চিনা লয়। ভাঁড়ার ঘরটা বদলি দিয়ে পাকশাল আর পিছাহারী বারিন্দা ঢাকি দিয়ে ভাত খাবার টেবুল? কেবল কয়লা কুঠি, কাঠকুটো জ্বালানী আড়তের এই স্থানটা এট্টু ঠেইলে দিচি বাইরপানে।
তারপর নতচোখে লাজুক মুখে বলল, “ওইটেই আমার এতকালের বাসস্থান। এট্টু সাইরে সুইরে নিলাম আর কী। এই বেলা চিনতে পারলেন?” ভ্যাবলা চোখে মাথা নাড়লেন বাচ্চু রায়। চোখে চিনতে না পারলেও নামে চিনলেন। তাহলে কি…
– এবার পিছন বাগে চান দিকি?
বদনচাঁদের নির্দেশে পিছন ফিরে চাইতেই হৃদপিণ্ডটা দুহাত লাফিয়ে উঠল বিস্ময়ে। ওই তো চামেলীকুঞ্জ। তাহলে এই কি সেই পুরোনো পাকশালা আর তার সংলগ্ন এলাকা… এটিই তার…
– এঁজ্ঞে হাঁ। এই হল বাড়ির লক্সা, মাপজোক, এই জমির জরিপ…
বাচ্চু রায় এমনই আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠলেন যে অন্ধকার ছাদের আশপাশের বড় বড় গাছের ডালে নিশ্চিন্তে ঘুমন্ত পাখিরা বিরক্তিতে পাখা ঝটপট করে উঠল। আর তাই শুনে সম্বিত পেয়ে বদনচাঁদের হাত থেকে বাড়ির প্ল্যান, খসড়া, ব্লু-প্রিন্ট, হ্যানো-ত্যানো সব ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়ে শিশুর মতো লাফাতে লাফাতে সিঁড়ির দিকে ছুট লাগাল খুকুরানি দিদিমণি ওরফে বাচ্চু রায়। “কাকাবাবুর কাছে এখনই জমা করে দিয়ে আসি বদনকাকা। নয়তো আবার কে কোথায় হারাব… আমাকে বিশ্বাস নেই বাপু।”
– আ-র হারাতে দিলি তো? রইলেম না আপনের ঘরের লগে লগে, আমার নিজের কোয়ার্টারে…
খোনা খোনা গলায় হা-হা করে হাসতে হাসতে বদনচাঁদের চোখ দিয়ে জল এসে গিয়েছিল বোধ হয় আনন্দে, আর তার বদান্যতার আতিশয্যে তার খুকুরানি দিদিমণিরও।

ছবি – সুমিত রায়

To Top