গল্পটা বেড়াল নিয়ে। তবে একা নয়, সাত-সাতটা গল্পের বেড়াল যেদিন ঝুলি থেকে বেরিয়ে পড়ল। তখন অবেলা। ফকির পাঠক লেন ধরে ঠুক-ঠুক করে একটা শব্দ বেড়াল-বাড়ির দিকে এগিয়ে এল। বাড়ির ফটকগোড়ায় এসে থামল শব্দটা।
এক বুড়ো মানুষ। বেশ বুড়ো। তাঁর এ হাতে লাঠি, ও হাতে ঝোলাব্যাগ। ডাঁটি-ভাঙা চশমা দড়ি দিয়ে মাথায় বাঁধা। চোখে ছানি। কোমরে বাত। তিনি দম নিলেন। এদিক-ওদিক তাকালেন। ঠিক ঠিকানায় এলেন তো? ফটকের থাম্বাটার দিকে নজর পড়ল তার। সেখানে একটা ফলক সাঁটা। লাঠিসমেত কাঁপা কাঁপা হাত কপালের ওপর রেখে তিনি সেই ফলকলিপির পাঠোদ্ধার করলেন। অস্ফুটস্বরে আওড়ালেন ‘বিড়াল হইতে সাবধান!!!’
তিনটি বিস্ময়চিহ্নের জন্য তার মনে তখন তিনটিই প্রশ্নচিহ্ন। সাবধান? বিড়াল হইতে? বিড়ালটি কি তবে এ্যালশ্যাসিয়ান? তা ওটা ওখানে কেন বাপু, রন্ধনশালায় লটকে দিলেই তো পারত।

বিড়াল হইতে সাবধান সরল দে
যাই হোক, ফটকের আংটা খুলে ঠুক ঠুক করে তিনি বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। তখনও গজগজ করে যাচ্ছেন, “তা ছাড়া সাবধানের মার নেই বটে, কিন্তু মারেরও কি সাবধান আছে বাবা?”
আরও এক পা বাড়িয়েছেন। হঠাৎ বাধা পড়ল। কে যেন কাকে মার-মার করে তেড়ে আসছে। গ্রিলগেটের ফাঁক গলে লাফিয়ে পড়ল ধুমসো এক বেড়াল। আর তখনই তাকে ধাওয়া করে ছুটে এল মারমুখো একটা ছেলে। তার হাতে লম্বা ঝুলঝাড়ু। কী সর্বনাশ। ওটা দিয়ে বেড়াল পেটাবে নাকি? ভারী বদ ছেলে তো। তবে আজকালের ছেলে, মুখ না খোলাই ভালো। কিন্তু বুড়ো মানুষ বলেই ফেললেন, “মেরো না বাবা, মেরো না… আহা কেষ্টর জীব।”
“ফালতু বকছ কেন? কে বলেছে কেষ্টর জীব? জে পি চ্যাটার্জীর পোষা জীব ওটা, ভারী ঠ্যাঁটা!” বলে ফের ঝুলঝাড়ু উঁচিয়ে ধরল ছেলেটা।
দারোগাজেঠু বাথরুমে ঢুকেছেন। এক ঘণ্টার আগে বেরোবেন না। এই সুযোগ। পাজিটা আজ তার ঘুঁড়ি ফাঁসিয়েছে। মজা টের পাবে এবার। বেড়ালটা সত্যিই বেয়াড়া। ছুটন্ত বল হয়ে সে তখন পাঁচিল টপকে ওভার বাউন্ডারি। তারপর পাশের বাড়ির পাঁচিলে উঠেই — ‘ম্যাঁও।’ যেন ভেংচি কেটে বলল, “এবার?” টুবলু তখন আরও খেপে গেল। ঝুলঝাড়ুটাকে উঁচিয়ে ধরল। যতটা পারে। তবে বেড়ালটাও সেয়ানা। টপাং করে লাফিয়ে পড়ল বুড়োদাদুর টাকের ওপর। তারপর পা পিছলে মাটিতে পড়েই কোনদিকে যে হাওয়া!
বুড়ো মানুষ সকাল থেকে হাঁটাহাঁটি করে তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে। তার ওপর মাথায় বেড়াল পতন। এত সয়? থপাস্‌ করে তিনি সেখানেই বসে পড়লেন। তারপর কোমরে একখানা হাত রেখে কাতরে উঠলেন, “উ-হু-হু গেছি রে বাবা… গেছি, ওরে ও জয়পাঁচু। একবারটি বেরো বাবা, দেখে যা তোর বেড়ালের কীর্তি…”
ছেলেটাও তখন হতভম্ব। যাঃ পড়ে গেল? সহানুভূতির সুরে বুড়োদাদুর উদ্দেশ্যে বলল, “দেখলেন তো, বেড়ালটা সাংঘাতিক!”
“দেখলুম না দেখালে? যাক গে জয়পাঁচুকে এবার ডেকে দাও দাদু। সে-ই এসে দেখুক।”
“জয়পাঁচু আবার কে? আমার জেঠু তো জে পি চ্যাটার্জী।”
“ওই হল রে বাবা, ওই হল। যে আল্লা, সেই ভগবান। যে জয়পাঁচু সেই জে পি চ্যাটার্জী।”
“বলেছি তো এটা জে পি চ্যাটার্জীর বাড়ি। জয়পাঁচু বোধ হয় বুড়োপঞ্চাননের মন্দিরে থাকে। সেখানে যাও।”
বুড়োদাদু তখন অধৈর্য। অকালপক্ক ছেলেটার ভরসায় না থেকে নিজেই গলা বাড়ালেন, “ওরে ও পাঁচু ঘরে আছিস? ও পাঁচু। পেঁচো রে, সাড়া দে বাবা।”
ওদিকে বাথরুম থেকে তখন জে পি চ্যাটার্জির কান খাড়া। তাঁর হারানো দিনের পুরনো নাম ধরে কে ডাকে? ওই নামে যারা ডাকত, তারা তো সব একে একে আউট। তবে?
উদ্বিগ্ন জে পি বাথরুম থেকে বেরোলেন। তাড়াহুড়োয় পরলেন গামছা। গায়ে জড়ালেন লুঙ্গি।
“কে রে টুবলু? কে ডাকছে রে?”
দারোগাজেঠুর গমগমে গলা। থমথমে মুখ। পুরুষ্ট গোঁফ থেকে টস টস করে জল গড়াচ্ছে। তাঁকে আসতে দেখেই ছেলেটা কার্নিসের ঝুল ঝাড়তে শুরু করল। একেই বলে উপস্থিত বুদ্ধি।
বুড়োদাদু চোখ তুলে তাকালেন। হ্যাঁ, সেই মুখ। সেই চোখ, কিন্তু গোঁফ? ওঠেইনি তখন।
“পাঁচু এয়েছিস? বাঁচালি বাবা।”
“আপনাকে তো ঠিক…”
“চিনতে পারলি না? তা বাবা তোর কী দোষ? কত বছর পরে দেখা। শেষ দেখেছিলি বোধ হয় জামগাঁর বাড়িতে। সেই যে নন্দীবাড়ি, মনে পড়ে?”
“খুব মনে পড়ে। সেই যে, এশিয়ার বৃহত্তম একান্নবর্তী পরিবার। গোটা পাড়া জুড়ে বিশাল বাড়ি। একবাড়িতে শ পাঁচেক লোক। সব একসঙ্গে। বাড়িটায় কত যে ঘর। রান্নাঘর কী! যেন যজ্ঞিবাড়ির রান্না। খাওয়ার ঘণ্টা বাজত। ছোটোদের আগে, বড়োদের পরে। …সে কি ভোলা যায়?”
“এই দ্যাখ, ঠিক মনে পড়েছে। আমি সেই নন্দীবাড়ির ঘোঁতামামা রে।”
নন্দীবাড়িতে তার নিজের মামাদের অনেক বন্ধু ছিল বটে। সেই সুবাদে তারাও মামা। তাঁর মামার বাড়ি জামগাঁর বামুপাড়ায়। সে বাড়িতে নন্দীমামাদের দু-একজন খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। ইনি হয়তো তাদেরই একজন।
ঘোঁতামামা বললেন, “কাশী থেকে ফিরে শুনলুম, তুই নাকি দারোগা হয়েছিলি। খুব নামডাক তোর… তা হ্যাঁ রে পাঁচু, শুনছি রিটায়ার করে তুই নাকি বেড়ালদের জন্য অভয়াশ্রম খুলেছিস। অতি মহৎ কাজ। তোর জয় হোক পাঁচু।”
টুবলু অমনি ফুট কাটল, “জীবে সেবা করে যেইজন, সেইজন…”
দারোগাজেঠু ধমক দিলেন, “থাম তোকে আর পাকামি করতে হবে না। যা, ভেতরের ঘরের ঝুল সাফাই কর গে।”
টুবলু চলে গেল। দারোগাজেঠু তখন সাদর অভ্যর্থনা জানালেন, তাঁর অবেলার অতিথি ঘোঁতামামাকে, “চলো মামা ভেতরে চলো… নাও ওঠো কুইক।”
কিন্তু ঘোঁতামামা উঠতে গিয়ে উঠতে পারলেন না, কাতরে উঠলেন, “উ-হু-হু- বাতের ব্যথাটা আবার চাগাড় দিয়েছে। ও পাঁচু, ধর বাবা, বুড়োটাকে তুলে ধর।”
দু হাত বাড়িয়ে আধ-বুড়ো ভাগ্নে তখন খুব-বুড়ো মামাকে টেনে তুললেন।
‘জয় বাবা বিশ্বনাথ’ বলে মামা বেড়াল-বাড়ির চৌকাঠ ডিঙোলেন।
গল্পটা এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু কোথাকার জল যে কোথায় গড়ায়!
বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধে। ঘোঁতামামা একটা ইজিচেয়ারে তখন আধশোয়া। ঢুলছেন। কাছেই টুবলু ক্যারম পিটছে। একা একা। বেচারা, সঙ্গী নেই। এ বাড়িতে দারোগাজেঠু একা থাকেন। টুবলু নাকি বেয়াড়া হচ্ছে। তাই ছুটিতে মা তাকে এখানে পাঠিয়েছেন। দারোগাজেঠু কড়া মানুষ। মায়ের আশা, ছেলেটাকে তিনি সিধে করে ছাড়বেন। কিন্তু সে যে হাঁপিয়ে উঠছে। আজ বুড়োদাদুটাকে পেয়েছে। মানুষটা ভালো। জোর করে তাঁকে একবার ক্যারম বোর্ডের সামনে বসিয়েছিল। কিন্তু যা হাত কাঁপে, পারবেন কেন?
ওদিকে বেড়ালঘরে তখন দারোগাজেঠু বেড়ালদের শরীর-স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ব্যস্ত। কোনটার গা গরম, কোনটার সর্দিকাশি, কার পেট কনকন ইত্যাদি। পরীক্ষাপর্ব শেষ হতেই সাতটা বেড়াল ছুটল সাতদিকে।
একটা আবার গেল ঘোঁতামামার পায়ের কাছে। তিনি টের পেলেন না। তাঁর চোখদুটো বন্ধ। ঠোঁট দুটো ফাঁক। হাঁ করে ঢুলছেন। বেড়ালটা তাঁর পা চাটছে। আঃ! ভারী আরাম। খানিকক্ষণ বাড়ির অতিথিসেবা করে বেড়ালটা তাঁর কোঁচার খুঁট ধরে টান মারল। এটা বোধ হয় আবদার। জোরে টান পড়তেই ধড়মড়িয়ে উঠলেন ঘোঁতামামা।
“কে রে?”
বুড়োদাদুর ‘কে রে’ শুনে টুবলু ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল। আশ্চর্য দৃশ্য। বুড়োর সঙ্গে বেড়ালের টাগ-অফ ওয়ার ধুতি নিয়ে।
“এই তুলতুলি, কী হচ্ছে ওটা? এদিকে আয়, নইলে…” বেড়ালটাকে ধমক দিতে গিয়ে থেমে গেল টুবলু।
ও বাড়ি থেকে নাকিসুরে নালিশ ভেসে এল এ বাড়িতে। “বা রে, আমি কী করেছি?… ও মা, দেখো না দাদা আমায় শুধু শুধু বকছে।”
এই সেরেছে! পাশের বাড়ির খেঁদিটার নাম আবার তুলতুলি। এ ঘরের জানলার মুখোমুখি, আড়াই তিন হাতের তফাতে ও বাড়ির একটা ঘরের জানলা। আহ্লাদি মেয়েটা ভেবেছে তার দাদা বকেছে। দাদাটা তো টুবলুরই বয়সি।
নাম বিভ্রাট। ফলে ভুল বোঝাবুঝি। প্রায়ই এমনটা হয়ে থাকে। ও বাড়ির মা সেদিন এ বাড়িকে শুনিয়ে বলেছিলেন, “বেড়ালের আর নাম পেলে না? আদিখ্যেতা। দেব একদিন একটার গায়ে গরম জল ঢেলে।”
শুনে জেঠুও টগবগ করে ফুটে উঠেছিলেন, “জানিস টুবলু, ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ দণ্ডনীয় অপরাধ। আমার বেড়ালের নাম আমি যা খুশি রাখব, তাতে কার কী?”
সঙ্গে সঙ্গে ও বাড়ির সবকটা বাসন যেন ঝনঝন করে বেজে উঠল, “আসুক না এবার রান্নাঘরে, দেব খুন্তির ছ্যাঁকা।”
তবে দারোগাজেঠুও তেমনি। বেড়ালের নাম পুষি, মেনি রাখলেই হতো। তা নয়, এটা তুলতুলি, ওটা ফুটফুটি, সেটা টুকটুকি। নামের বাহার কত।
ঘোঁতামামার আফিমের অভ্যাস। ঝোলায় আফিম বাড়ন্ত। ইজিচেয়ারে সিধে হয়ে বসলেন তিনি। জয়পাঁচুকে ডাকতে হবে। সে আবার ও ঘরে। এ ঘর থেকেই তিনি গলা বাড়ালেন।
“ও পাঁচু, এ ঘরে একবারটি আসবি? সময় হবে?”
ডাক শুনে দারোগাজেঠু এলেন। এসেই আগে টুবলুকে তুললেন, “যা, এবার বইটই খুলে বসে পড়। আমি আজ তোকে সময় ও কার্যের অঙ্ক শেখাব। ও ঘরে যা।”
টুবলু উঠে গেল। তারপর দারোগাজেঠু চাপা গলায় বললেন, “একটা কথা মামা, এখানে আমাকে পাঁচু বলে ডাকবে না। জয়পাঁচুও চলবে না।”
“তবে কী বলে ডাকব বাবা?”
“কেন, তুমি আমাকে ডাকু বলে ডাকবে, খুব ছোটোবেলায় মা আমাকে ডাকু বলে ডাকত।”
“সে কী রে, দারোগাকে ডাকু বলব! শুনে তোর বেড়ালরাও হাসবে যে!”
তাই তো, খুব বেফাঁস বলেছেন। মনে মনে তিনি লজ্জায় জিভ কেটে ফের মাথা চুলকে স্মৃতির ঝুলি থেকে তুলে আনলেন আর একটা নাম।
“মা আমাকে মন্টা বলেও ডাকত, তুমি না হয়…”
“বাঃ বেশ মিষ্টি নাম! তা হ্যাঁ রে মন্টা, আমার যে আফিম চাই বাবা, নইলে ঘুম হবে না।”
“সে ব্যবস্থা হবে, তোমার চিন্তা নেই।”
বলে দারোগাজেঠু বেড়ালটাকে কোলে তুলে নিলেন। সেটাকে আদর করতে করতেই বেরিয়ে গেলেন। এসেই বললেন, “চলো আবার তোমাকে বাইরের ঘরে রেখে আসি। বিছানা রেডি।”
গ্রিলগেট থেকে বারান্দায় ঢুকেই বাঁ কোনায় ছোট্ট ঘর। এটাই দারোগাজেঠুর বৈঠকখানা। বেশ নিরিবিলি। সে ঘরে একটা সোফা কাম বেড। একটা টেবিল। একটা আলমারি, তাতে পুলিশি জীবনের নাম কীর্তির নিদর্শন। কয়েকটা ছোট বড়ো মেডেল ঝোলানো।
টেবিলে একটা বড়ো জামবাটি। উপুড় করা একটা গেলাস। তার পাশে জলের জগ। সব ঠিকঠাক। দারোগাজেঠুর কাজই এমন ত্রুটিহীন। ঘটি থেকে গরম দুধ জামবাটিতে ঢেলে ঢাকা দিলেন। মশারিটাও খাটিয়ে দিলেন কায়দা করে।
“রাতে তো তুমি কিছু খাও না বললে। দুধ রইল আর এই তোমার আফিম। নাও, শুয়ে পড়ো এবার।”
বিছানায় আরাম করে বসে ঘোঁতামামা আধবোজা চোখে বললেন, “তোর মঙ্গল হোক পাঁ- না, না, মন্টা। হ্যাঁ, মন্টাই তো।”
“আশা করি তোমার আর ভুল হবে না। আচ্ছা তোমার সুনিদ্রা হোক। গুডনাইট।” বলে দারোগাজেঠু বেরিয়ে এলেন।
ঘোঁতামামা বসে বসে খানিকক্ষণ ঢুললেন। তারপর ঘুম চোখে খানিকটা আফিম ঢেলা পাকিয়ে টুপ করে ফেলে দিলেন জামবাটির দুধে। গেলাসে ঢেলে চোঁ চোঁ করে টেনে নিলেন।
ঘুম চোখেই তিনি সব কাজ সারলেন। আফিমের ঢেলাটা কি বড়ো হয়ে গেল? হতেও পারে। গেলাসে দুধ ঢালতে গিয়ে ছলকে খানিকটা মাটিতে পড়ে গেল কি? হবে হয়তো।
ঘোঁতামামা ঘুমিয়ে পড়লেন।
রাত গভীর হল। বাইরে কোথাও সাড়া-শব্দ নেই। এ ঘরেই যা একটু শব্দ-টব্দ। নাক ডাকার। টেবিলঘড়ির। আর খানিক বাদে মেঝের ওপর চুক চুক করে কিছু একটা চেটে খাওয়ার শব্দ। তারপর অন্ধকারে একটা সচল বস্তু নড়াচড়া করেই অচল হয়ে পড়ে রইল এককোণে। থাক! কে আর দেখছে?
দরজাটা ভেজানোই ছিল ভেতর থেকে। খিল আঁটেনি কেউ। কে আর আঁটবে?
আস্তে আস্তে খুলে গেল ভেজানো দরজা, নিঃশব্দে।
বুড়োদের ভোর-ভোর ওঠার অভ্যাস। ঘোঁতামামাও ওঠেন। সেদিন কিন্তু একবার ‘জয় বাবা বিশ্বনাথ’ বলে পাশ ফিরতেই আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।
সেই আওয়াজে মেঝের ওপর কে যেন নড়েচড়ে উঠল। বসে চোখ রগড়াল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আচ্ছন্ন হয়ে। হঠাৎ নজরে পড়ল পুঁটুলিটা। অমনি ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, “ওরে বোকা বসে বসে এখনও ঢুলছিস? কেটে পড়, শিগগির কেটে পড়।”
পুঁটুলিটা কাঁধে ফেলে সে উঠে দাঁড়াল। পা টলছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। পুঁটলি এত হালকা আর নরম কেন? কে জানে। বেতালা পায়ে টলটল করে, চোখ খুলে, চোখ বুজে, বারান্দায় গ্রিল গেটের সামনে এসেই তার ঘোর কেটে গেল।
গেট খোলা। সামনে গোঁপওলা লম্বাচওড়া একটা মানুষ স্থির দৃষ্টিতে তাকে দেখছে, তার কাঁধের পুঁটলিটা হঠাৎ ‘ম্যাঁও’ করেই লাফিয়ে পড়ল কাঁধ থেকে। ‘ওরে বাবা রে।’ বলে সে অমনি ছুটল পিছন ফিরেই। ছুটতে ছুটতে ফের ঢুকে পড়ল ঘোঁতামামার ঘুম-ঘরে। ঢুকেই মেঝের ওপর পড়েই লম্বা।
‘ধর, ধর’ করে দারোগাজেঠুও ছেলেটাকে ধওয়া করে সেই ঘরে। কিন্তু তখন আর ধরবার দরকারই বা কী? “ব্যাটা বেড়াল চোর!” বলে তিনি চোরকে ধরে বসিয়ে দিতেই সে আবার গড়িয়ে পড়ল। আফিমের কড়া নেশা। তার ঠোঁট নড়ছে। বিড়বিড় করে বলছে, “ছিল পুঁটলি হয়ে গেল বেড়াল।”
হই-হল্লায় ঘোঁতামামার ঘুম চটকে গেল। উঠে বসে চোখ রগড়ালেন। বিছানা থেকে পা নামালেন। পায়ে ঠেকল পুঁটলি। এখানে তো বেড়ালটা ছিল। গেল কোথায়?
“ও রে মন্টা, এ কী হল?”
“কেন, তোমার আবার কী হল?”
“এই দ্যাখ বাবা, ছিল বেড়াল হয়ে গেল পুঁটলি!”
“তোমার ঘরে বেড়াল ছিল?”
“ছিল তো, তোর এই গদি-খাটের তলায় ছিল। পরে ঠিক এখানটায় শুয়ে ঘুমোচ্ছিল। আমি একবার টের পেয়েছিলুম ভোরের দিকে। কিন্তু…”
ঘোঁতামামার ‘কিন্তু’ শুনে দারোগাজেঠুর মনে তখন একটাই প্রশ্ন। তিনি শুধোলেন, “আফিম-গোলা সব দুধটা তুমি খেয়েছিলে?”
“না তো, অর্ধেকটার মতো গ্লাসে ঢেলে খেয়েছিলুম। বাকিটা তো জামবাটিতেই ছিল। কিন্তু… কিন্তু জামবাটিটা কোথায় গেল?”
“এই যে দেখাচ্ছি।” বলে পুঁটলির গিঁট খুললেন দারোগাজেঠু।
“এই তো জামবাটি, আরে এই তো আমার মেডেল। টেবিলঘড়িটাও!”
ঘোঁতামামাও আশ্চর্য হয়ে বললেন, “আমার ট্যাঁকঘড়ি! ওই তো। ও রে পাঁ- মানে মন্টা ছিল তো টেবিলে, কিন্তু…”
দারোগাজেঠুর গোঁফের ফাঁক দিয়ে একটা চাপা আওয়াজ বেরলো। ‘হুম।’ তারপরে হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। ভূতপূর্ব দারোগার অভূতপূর্ব হাসি। ঘরের ছাদে চিড় ধরল কিনা কে জানে।
দারোগা জে পি চ্যাটার্জি ওরফে পাঁচু, ওরফে ডাকু, ওরফে মন্টা হাসতে হাসতে বললেন, “তোমার আফিম গোলা দুধ আর তুলতুলি। আমার টেবিলঘড়ি আর তোমার ট্যাঁকঘড়িই শুধু বাঁচায়নি, চোরকেও হাত-কড়া ছাড়াই পাকড়েছে। যা আমি সারা দারোগা জীবনেও পারিনি।”
টুবলু কখন এসে দাঁড়িয়েছিল, সে বলল, “তাহলে জেঠু, বাড়ির বাইরে লিখে দিই, বিড়াল ও আফিম হইতে সাবধান।”
জেঠু ধমক দিয়ে বললেন, “তোকে আর পাকামি করতে হবে না। যা বই নিয়ে বসে পড়। আজ তোকে বাঁদর আর তেলা বাঁশের অঙ্ক শেখাব।”

ছবি – সুমিত রায়

To Top