ভয়ের নাম গলগাথা প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

এক

একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল, আগুনে গরম। সুহেল এক মনে ভুট্টা চিবোচ্ছিল, গনগনে হাওয়ায় মনে হল মুখটা যেন ঝলসে যাবে। তাড়াতাড়ি মুখ নামিয়ে নিতে নিতে চেঁচাল, “টুপ, টুং… টুউউউপ, টুউউউং।” পেছন থেকে কান্নার শব্দ শুনে ঘুরে দেখে টুং কাঁদছে, ভয়ে দাদার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলেছে। টুপের সঙ্গে চোখাচোখি হল। টুপ হতাশ গলায় বলল, “বুডঢা যে বলেছিল এ সপ্তাহে নাকি ঝড় আসবে না।”
সুহেল অস্থির গলায় বলল, “তুই বুডঢার কথা রাখ দিকিন, ও আদিক্যালের যন্তরটাকে কেন যে রেখে দিয়েছে কে জানে। আমি বলেছিলাম তোকে এ মাসেই বেরোনোর দরকার নেই।”
“বোনটা তো আর বাড়িতে থাকতে পারে না রে, হাঁফিয়ে ওঠে। আর এ মাসে না বেরোলে আর কবে বেরোতিস বল? এরপর আর বাইরে বেরিয়ে শ্বাস নিতে পারবি? একে ঘুটঘুটে অন্ধকার, তার ওপর বিষকালো হাওয়া।”
“বহুকাল আগে নাকি ওই সময়টাকে শীতকাল বলত। শীত ব্যাপারটা কেমন ছিল কে জানে।” সুহেল আগুনে হাওয়া থেকে বাঁচতে ভুট্টা ক্ষেতের মধ্যে প্রায় শুয়েই পড়েছিল। শুয়ে শুয়ে আধখাওয়া ভুট্টায় আরেকটা কামড় লাগাতে গিয়ে থু থু করে ফেলে দিল, ধুলোতে ধুলোতে ভরে গেছে। জিভময় বালি বালি স্বাদ। সারা মুখ জুড়ে কীরকম কালো কালো দানার আনাগোনা। সুহেল চ্যাক-চ্যাক শব্দ করতে করতে মুখ ঝাড়ছিল, সেই শুনে টুং হি-হি করে হেসে উঠল।
“অমনি হাসি, না রে পেত্নী?” সুহেলের বিরক্ত গলা, “আর হাসতে হবে না, কতক্ষণ এখানে আটকে থাকিস তাই দেখ। টুপ, তোর ব্যাগে জল আছে?”
টুং আবার কাঁদতে শুরু করল, অন্য সময় হলে টুপ বন্ধুকে বকত, কিন্তু এখন ও-ও বেশ ভয় পেয়েছে। সুহেলকে জলের বোতল এগিয়ে দিতে দিতে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, “কয়েক ফোঁটা খাবি কিন্তু। বাড়িতেও খাবার জল প্রায় শেষ।” তারপর আকাশের দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, “শেষবার এই ঝড়টা টানা দুদিন চলেছিল। মনে আছে তোর?”
“মনে আবার নেই? পাগলা বিনু তো ওই সময়েই…”
পাগলা বিনু, এই ঝড়ের মধ্যে পড়েই বেচারা নিখোঁজ হয়ে যায় দু মাস আগে। ওর কথা উঠতেই টুপের মনটা ভারী উদাস হয়ে গেল। টুং-ও কান্না থামিয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল।
“আমরাও মরে যাব সুহেল?” টুং এর প্রশ্নে সুহেলের ভারী মায়া হল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “দূর পাগলি, আমরা মরব কেন? বড় জোর প্রচুর ধুলো খেয়ে পেট টইটম্বুর হয়ে থাকবে। আমরা কি আর বিনুর মতন রেতকালোর মাঠে চলে এসেছি? আর তা ছাড়া বিনু মরেছে সে কথাই বা কে বলল?”
বলতে বলতে চোখ টিপল টুপকে – বিনুকে পাওয়া যায়নি ঠিকই, কিন্তু সে যে বেঁচে আছে এমন কথা বলার লোক এ চত্বরে নেই। টুপ ওর ব্যাগ থেকে একটা চাদর বের করে বোনের মাথায় জম্পেশ করে পাগড়ি বাঁধছিল, যাতে নাক-কানগুলো চাপা থাকে। সুহেলের কথা শুনে একটু থমকে গেল, “আরে তাই তো! আমিও এক কথা শুনেছি, কিন্তু ও পাগল করছিলটা কি রেতকালোর মাঠে?”
সুহেল মুচকি হেসে তাকাল, “বল দিকিন। ভাব, ভাব।” টুপ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ চরম অবিশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠল, “সত্যি? দ্যুত, হতেই পারে না।”
সুহেল মাথা নাড়ল, “হয়েছে, তা-ই হয়েছে।”
টুং এতক্ষণ চুপটি করে কথা শুনছিল, এখন আবার কান্না জুড়ে দিল, “আমি কিছ্‌ছু বুঝতে পারছি না। বল সুহেল, বল।”
“এই সুহেল দাদা বল।” বলতে বলতেই সুহেল চেঁচিয়ে উঠেছে, “শিগগির মাথা নামা, মাথা নামা বলছি।”
টুপ আর টুং প্রায় হুমড়ি খেয়ে ভুট্টক্ষেতের মধ্যে মুখ লুকোল। ওদের মাথা লক্ষ্য করেই যেন ছুটে আসছিল ধুলোর সমুদ্র। কিন্তু সে ধুলো এসে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে হ্যাঁচকা টানে টুং-এর মাথা থেকে চাদরটা খুলে নিয়ে তিনজনকে ঢেকে ফেলেছে সুহেল। সে টুংকে দেখতে পাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু ও জানে টুং-এর মুখ ভয়ে নীল হয়ে গেছে। টুপের কানে ফিসফিস করে বলল, “মাথায় হাত বোলা, ভয় পেতে দিস না।”
“টুং, শুনবি নাকি বিনু কেন গেছিল রেতকালোর মাঠে?”
উঁ-উঁ করে যে কান্নার শব্দটা ভেসে আসছিল, সেটা থামল। ধরা ধরা গলায় জবাব এল, “আমার ভয় করে।”
“দূর গাধা, ভয় কী! গল্পটা শোন না…”
“টুং, তুই গলগাথার নাম শুনেছিস?”
বুঝতে পারল টুং মাথা নাড়ছে, “জানি, আমাদের বুডঢা বলেছে।”
সুহেল এবার রেগে গেল, “সবেতে খালি বুডঢা আর বুডঢা। ও বোকা মেশিনটা কিছু জানে না।”
আপাতত ধুলোর ঝড়টা গেছে, টুং উঠে বসতে বসতে বলল, “তুমি বুডঢার নামে কিচ্ছু বলবে না বলছি। ও না থাকলে কে আমাদের পড়াত শুনি। তুমিও তো বুডঢার থেকেই শুনেছ গলগাথার ব্যাপারে।”
“মোটেই না, আমি শুনেছি আমার দাদির থেকে।”
টুং খিলখিল করে হেসে উঠল, “সে-ও তো বুডঢা”।
“উঁহু বুডঢি।” টুপ নিজের আর বোনের মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “গলগাথার কথা কী বলছিলিস যেন।”
সুহেল মাথা নাড়ল, “গলগাথার আসল নাম কী ছিল সে তো জানিস।”
“কলকাতা, কলকাতা।” চেঁচিয়ে উঠল টুং। তারপর ফিচেল হেসে বলল, “বুডঢা বলেছে।”
সুহেল চোখ পাকাল, “বুডঢা অনেক কিছুই বলে। বিনু একদিন বলছিল, বুডঢা নাকি ওকে জানিয়েছে যে কলকাতা এখনও আছে, আর তাও আবার আমাদের গ্রামের খুব কাছেই।”
টুপ বিরক্ত হয়ে বলল, “যত বাজে কথা। আজ তিনশ বছর হল কলকাতা শহর ভূমিকম্পে সমুদ্রের তলায় ডুবে গেছে। কলকাতা আবার কোথা থেকে আসবে? গলগাথা বলেও কিছ্‌ছু নেই, স্রেফ রূপকথা।”
“জানি তো।” সুহেল লম্বা লম্বা পাতার মধ্যে দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছিল ধুলোর ঝড় আবার আসছে কিনা। “সাধে কী আর বিনুকে পাগল বলত সবাই। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হত ছেলেটার মাথায় প্রচুর বুদ্ধি, নিজের খেয়ালে থাকে বলে আমরা সবসময় বুঝতে পারি না।”
টুপ উঠে দাঁড়িয়েছে। সুহেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “দৌড় দিবি? পরের ঝড়টা আসার আগে যদি পৌঁছে যেতে পারি।”
অস্বাভাবিক গরম কিন্তু আকাশটা এখন মোটামুটি পরিষ্কার লাগছে। সুহেল একটু ভেবে মাথা নাড়ল, “চল।”

দৌড়, দৌড়, দৌড়… ভুট্টা ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে দৌড়চ্ছে তিন জন… দিগন্তবিস্তৃত ভুট্টা ক্ষেত। আর তো কোনও কিছুর চাষ হয় না, যতদিকে চোখ যায় শুধু ভুট্টাগাছের লম্বা লম্বা পাতা। দূর থেকে আবছা দেখা যাচ্ছে একতলা বাড়িটাকে। বুডঢার বাড়ি, গ্রামের সীমানা। তারপর আরও দশ মিনিট গেলেই ওরা পৌঁছে যাবে নিজেদের বাড়িতে।
তিনজন প্রায় এসে পড়েছে ভুট্টক্ষেতের শেষ প্রান্তে, টুপ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “টুং, এই টুং, দাঁড়িয়ে রইলি কেন?” টুং উলটোদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, ওর পা যেন আটকে গেছে মাটিতে। সুহেল আর টুপ দুজনেই এবার দেখতে পেয়েছে, ওরা জানে টুং কী দেখছে।
ক্ষেত পেরিয়ে আকাশটা যেখানে শুরু হয়েছে যেন সেখান থেকেই নেমে আসছে একের পর এক কালো কুণ্ডলী, চক্রাকারে পাক খেতে খেতে নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে। এ ঝড় ওরা আগে কখনও দেখেনি।
“টুউউউপ, পালা, পালা, পালা।” সুহেল টুংকে কাঁধে তুলে নিয়েছে। টুপ ভয়ে, বিস্ময়ে কাঠ হয়ে দেখছিল সারা মাঠ লন্ডভন্ড করতে করতে এগিয়ে আসছে দৈত্যাকার কুণ্ডলীগুলো। কালো ধুলোয় আস্তে আস্তে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে দৃষ্টিপথ। ওদের সারা শরীর জুড়ে শুধু ধুলোর প্রলেপ।
“পালা টুউউপ।” আবার চেঁচিয়ে উঠল সুহেল। এইবার সম্বিত ফিরেছে টুপের। প্রাণপণে দৌড়চ্ছে, ধরে ফেলেছে সুহেলকে। সুহেল কিছু বলছে, কিন্তু ঝড়ের ভয়ঙ্কর শোঁ-শোঁ আওয়াজে ভালো করে কিছুই শোনা যাচ্ছে না। টুপ আকারে ইঙ্গিতে দেখাল কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছে না। সুহেল এবার আঙ্গুল দিয়ে কী যেন দেখাচ্ছে। বুডঢার বাড়ি দেখাচ্ছে কি? হ্যাঁ, বুডঢার বাড়িই তো। দরজা খুলে টুংকে নিয়ে ঢুকে পড়েছে সুহেল।
কিন্তু টুপ বোধ হয় আর পৌঁছতে পারল না। আর কয়েক হাত, কিন্তু একটা অস্বাভাবিক কালো কুণ্ডলী ওকে গ্রাস করে নিচ্ছে। জিভ, গলা বেয়ে টুপের ফুসফুসের মধ্যে যেন ঢুকে যাচ্ছে লবণাক্ত ধুলোর স্রোত। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার ঠিক আগে বুঝতে পারল ও মাটি থেকে উঠে পড়েছে…
কিন্তু না, ঝড় নয়, ওকে উঠিয়ে নিয়েছে একটা ধাতব হাত।

 

দুই

“উঠে পড় টুপ, উঠে পড়।”
সুহেলের গলাটা কানে আসা মাত্র ধড়মড় করে উঠে বসেছে টুপ – “টুং, টুং?”
“টুং ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে।”
ভারী অবাক হল টুপ, “বেরোতে হবে?”
সুহেল একটু বিরক্ত, “ওরম হাঁ করে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, বুড়োটা বড্ড খ্যাঁচম্যাচ করছে।”
যে ধাতব হাত একটু আগে ওকে টেনে নিয়েছিল বাড়ির ভেতর, সেই হাতই এবার সুহেলকে টেনে সরিয়ে এগিয়ে এল। স্পষ্ট অথচ খনখনে গলায় বুডঢা নামক যন্ত্রমানব বলল, “সময় নেই, সময় নেই, সময় নেই। টুপ ওঠো, টুপ ওঠো, টুপ ওঠো।”
টুপ সুহেলের দিকে তাকাল, “সব কথা তিনবার করে বলছে কেন রে? এরকম তো করে না কখনও। গলাটাই বা এরকম খোনা কেন?”
“জানি না বাপু।” সুহেল স্পষ্টতই বিরক্ত।
টুং ঘরের এককোণে চুপ করে বসেছিল। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “দেখো, দেখো, বুডঢার গায়ের রঙ দেখো।”
টুপ আর সুহেল দুজনেই এবার অবাক হয়ে দেখল বুডঢার রুপোলি ধাতব শরীরে কখন যেন রঙিন ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে, আস্তে আস্তে টকটকে লাল হয়ে উঠছে। বুডঢার পেটের ওপরের স্ক্রিনে আচম্বিতে ছবি ফুটে উঠতে শুরু করল। বিন্দু বিন্দু পিক্সেল থেকে ক্রমশ ফুটে উঠতে লাগল একটা মানুষের মুখ। চেনা চেনা লাগছে মুখটা, হ্যাঁ এবার চিনতে পেরেছে টুপ। অবিশ্বাস্য!
সুহেলকে একটা চিমটি কাটল ও। সুহেলের-ও চোখের পলকের পড়ছে না। ফিসফিস করে বলল, “বিনু!”
স্ক্রিনের বিনু কথা বলতে শুরু করেছে। একরাশ কোঁকড়া চুলের ছেলেটার মুখে স্বভাবসিদ্ধ হাসিটি নেই। বড় উদ্বেগের গলায় বলে চলেছে, “এ ভিডিও মেসেজ দেখতে পেলে জানবেন আপনার হাতে আর সময় নেই। যে বিপদের কথা আমরা শত শত বছর ধরে শুনে আসছি, সেই বিপদ আসন্ন। যে প্রলয়ঝঞ্ঝায় আজ থেকে তিনশ বছর আগে অর্ধেক বাংলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছিল, কলকাতা সমেত বঙ্গোপসাগরের পাশের সমস্ত জনপদ ডুবে গেছিল সমুদ্রের তলায়, সেরকমই আরেক ঝড়ের সামনে পড়তে চলেছেন আপনারা, হয়তো এক সপ্তাহ, হয়তো এক মাসের মধ্যেই। ঠিক কতটা সময় আছে, সে কথা কেউ জানে না।” টুপ তাড়াতাড়ি টুংকে কাছে টেনে নিল। “এ বিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হল গলগাথা খুঁজে বের করা। সেই গলগাথা, যার কথা আমাদের রোবট শিক্ষকেরা বছরের পর বছর ধরে রূপকথা বলে শুনিয়ে এসেছে, সেই কঙ্কালপুরী গলগাথাতে পৌছতে পারলে তবেই পাওয়া যাবে নিরাপত্তা”
সুহেল আবার ফিসফিস করে টুপকে বলল, “কিন্তু দূষিত কলকাতায় কোটি কোটি মানুষ মারা যেত বলেই তো ওরকম নাম গলগাথা, হাড় আর খুলির শহর।”
সুহেল অবশ্য জানে না যে, কলকাতা পত্তনের আগে থেকেই ওলন্দাজরা এই নামে ডাকত বিপদসঙ্কুল সেই শহরকে।
টুপ বলল, “আর সে শহর খুঁজেই বা পাব কোথায়?” স্ক্রিন থেকে বিনু যেন শুনতে পেল ওদের কথা – “আছে গলগাথা, আমি জানি।” জ্বলজ্বল করতে লাগল বিনুর চোখ, “গলগাথার অস্তিত্বের প্রমাণ আমি পেয়েছি, আর সেই সঙ্গে জেনেছি এক বিশাল চক্রান্তের কথা। তিনশ বছর ধরে আমাদের সঙ্গে বিশাল অন্যায় হয়ে এসেছে, সেই অন্যায়ের নিরসনও ঘটানো দরকার।”
বিনুর স্পষ্ট অবয়ব আবার বিন্দু বিন্দু পিক্সেল হয়ে মিলিয়ে যেতে থাকল, “সব কথা বিশদে বলার সময় নেই, এখনই বেরিয়ে পড়তে হবে। বুডঢার প্রোগ্রামিং আমি নিজে করে গেছি, ওর সাহায্য ছাড়া এ বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়া যাবে না।” স্ক্রিন আবার সাদা, যেমন আচমকা শুরু হয়েছিল প্রায় সেরকমভাবেই শেষও হল।
“কী করবি সুহেল?” টুপ ফ্যাকাশে মুখে তাকাল।
“ভাবছি।” মাথা নাড়ল সুহেল, “পাগল বিনুর কথা কতটা বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু একটু আগেই যে ঝড় দেখলাম সেরকমও তো কোনওদিন দেখিনি।”
টুপ মাথা ঝাঁকাল, “হ্যাঁ, আর শেষ এক বছর ধরে কতবার এই ধুলোর ঝড় বয়ে গেছে ভাব! আর সেইরকম গরম, এমনও হয়েছে সময় সময় যে, লোকে বাড়ি থেকে এক পা ফেললে মারা গেছে।”
সুহেল একটা করুণ হাসি হাসল, “তোর মনে আছে, বুডঢা একবার আমাদের কালবৈশাখী ঝড়ের কথা বলেছিল? গরমকালে সে ঝড়ের জন্য সবাই পথ চেয়ে বসে থাকত, সে ঝড় নিয়ে আসত ঠান্ডার আশ্বাস। সব কীরকম বানানো কথা লাগে না? আমি তো জন্ম থেকে দেখছি ঝড় মানেই দুর্দান্ত গরম, সে ঝড়ের মধ্যে পড়লে মানুষ পুড়ে মারা যায়।”
টুং এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল, এবার বলে উঠল, “জানিস দাদা, বুডঢা আমাদের বলেছে তখন নাকি আকাশের রঙ ছিল নীল।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল টুপ, বুডঢা তাদেরও বলেছে একই কথা। কিন্তু আজ অবধি টুপ, সুহেল আর ওদের সব বন্ধুদের মধ্যে কেউ নীল আকাশ দেখেনি, আকাশের রঙ সদাই ধূসর, কেবল ঝড়ের সময়গুলোতে কালো হয়ে যায়।
সুহেল যেন একটু দোনোমনো করছে, “টুপ, বাড়ি?” টুপও একই কথা ভাবছিল। মাথা নাড়ল, “বাড়িতে কেউ বিশ্বাস করবে না বিনুর কথা। আর তার মানে বিনুর কথা যদি সত্যি হয়, বাড়িতে বসে থাকা মানে…” গলা ধরে এল টুপের।
সুহেল টুপের হাত জড়িয়ে ধরল, “ভাবিস না, আমরা বুডঢার সঙ্গেই যাব। কিন্তু টুং?”
টুং ছুটে এসেছে, সে দাদা আর সুহেল-অন্ত প্রাণ। টুপের কোলে মুখ গুঁজে বলল, “আমি তোমাদের ছেড়ে কোত্থাও যাব না।”

 

তিন

বুডঢা এত পুরোনো রোবট যে, ভয় হচ্ছিল সে টুপদের সঙ্গে সমান তালে চলতে পারবে কিনা। আগে গ্রামের এবড়োখেবড়ো পথে দশ মিনিট হাঁটলে গোঁ-গোঁ শব্দ করে দাঁড়িয়ে পড়ত, ফের রিচার্জ না করা অবধি নট নড়নচড়ন। বিনুর হাতে পড়েই ও বোধ হয় ভোল পালটেছে, ঘণ্টা দুয়েক দিব্যি হাঁটল টুপেদের সঙ্গে, শেষে ওদেরকে ফেলে একটু আগে আগেই হাঁটছিল।
মাথার মধ্যে চিন্তা থাকলেও একটা অ্যাডভেঞ্চারের নেশা ওদের পেয়ে বসেছিল। তার বড় কারণ হল এক ঘণ্টা পর বুডঢা যে কাঁটাতারের বেড়া কেটে ওদের বেড়ার উলটোদিকে নিয়ে এসেছিল, সে বেড়া যে টপকানো যায় এরকম ধারণাই ওদের ছিল না – গ্রামের এই দিকটায় ওদের আসা অবশ্য এমনিই বারণ। আজ অবধি যতবার কেউ ও বেড়া টপকেছে সে আর ফিরে আসেনি।
কথা বলতে বলতে অনেকক্ষণ খেয়াল ছিল না বুডঢা ঠিক কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওদের। সুহেল এবার চোখ তুলে তাকাতেই ওর হৃৎস্পন্দন প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।
“টুপ, কী সর্বনাশ!” প্রায় আর্তনাদ করে উঠেছে সুহেল। টুপও স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে। অস্ফুটে শুধু বলল, “রেতকালোর মাঠ।”
মাঠ নামেই, মরুভূমিই বলা উচিত – কালো বালিতে ভরা এ মরুভূমি। এ বিশাল জায়গা কতশ বছর আগে সবুজ ঘাসে ভরা ছিল কে জানে। ওরা জ্ঞান হওয়া পর্যন্ত শুনে এসেছে এ সর্বনাশা জায়গায় নাকি আবার চোরাবালিও আছে।
বুডঢা কিন্তু তরতর করে এগিয়ে চলেছে। টুপ বলল, “ডুবলে তো বুডঢাই আগে ডুববে, ওর পেছন পেছন যাওয়া যাক।”
টুং এতক্ষণ নাগাড়ে হেঁটে একটু হাঁপিয়ে পড়েছে, জিরিয়ে নিতে নিতে বলল, “তোমরা দেখেছ, বুডঢার কীরকম সাহস বেড়ে গেছে?” কথাটা সত্যি। এর আগে বুডঢাকে ওর নিজের ডেরা, মানে গ্রামের ছেলেপুলেদের স্কুল থেকে বের করতে গেলেই মহা ক্যাঁচরম্যাচর লাগিয়ে দিত। নানা বিপ-বিপ, কিরকির আওয়াজ বের হত। ওদের সবার তাই ধারণা বুডঢা মহা ভীতু।
সুহেল টুং-এর কথা শুনে হাসছিল। বুডঢাকে ডাকতে গিয়ে দেখে বুডঢা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছে আর ওর সেই অকেজো হাত, যেটা দিয়ে যাই ধরতে যেত সব ফেলে দিত, সেটা দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে রেতকালোর বালি খুঁড়ে চলেছে।
বুডঢা যতক্ষণ বালি খুঁড়ছিল ততক্ষণ এরা একটু খাবার খেল, ভিজিয়ে নিল গলা। স্কুলের রান্নাঘর থেকে যতটা শুকনো খাবার পারা যায়, ওরা নিয়ে নিয়েছে টুপের ব্যাগে। খাবার নিয়ে সমস্যা নয়, সমস্যা ছিল জল নিয়ে। পানীয় জল মহামূল্যবান একটি বস্তু, বহুদিনের অভ্যাসে ওরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা জল না খেয়ে থাকতে পারে, কিন্তু একটা সময়ে প্রাণে বাঁচার জন্য একটু জল তো দরকার। এদিকে স্কুলে একমাত্র যে জিনিস কাঁচের আলমারির মধ্যে বন্ধ থাকে, সে হল সার সার জলের বোতল। আজকে অবশ্য বুডঢা নিজেই সে আলমারি খুলে বের করে নিয়ে এসেছে বেশ কিছু বোতল। তারপর সাদা স্ক্রিনে লাল অক্ষরে নির্দেশ দিয়ে বুঝিয়েছে কতক্ষণ অন্তর ক ফোঁটা করে জল এরা খেতে পারে।

কটাং করে একটা জোর ধাতব শব্দ! কী হল বোঝার জন্য সুহেল আর টুপ এগিয়ে গেছিল। বুডঢা সরে যেতে যা দেখল, ওদের তাতে ভয়ে-বিস্ময়ে প্রায় বাক্যিহারা দশা। বুডঢার হাত বালি খুঁড়তে খুঁড়তে পেয়েছে এক গ্রিলওলা লোহার দরজা, আর সেই গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে একটা হাত। তবে সে হাতে চামড়া বা মাংস কিছুই নেই, রয়েছে শুধু ধবধবে সাদা হাড়।
সুহেল তাড়াতাড়ি গিয়ে হাতটাকে খোঁচা মেরে নীচে পাঠিয়ে দিল, যাতে টুং-এর নজরে না পড়ে। গ্রিলের ফাঁকফোকর দিয়ে ভালো করে ঠাহর করলেও প্রায় কিছুই দেখা যায় না, শুধুই অতলান্ত অন্ধকার। বুডঢা এদিকে দরজার পাশে বালি খুঁড়তে খুঁড়তে পেয়ে গেছে একটা আংটা। সেই আংটায় আবার পরানো রয়েছে এক বিশাল বড় তালা। এত বড় তালা সুহেল বা টুপ কেউই আগে দেখেনি। বুডঢার হাতে অবশ্য অসীম জোর আজ। তালা উড়িয়ে আংটা ধরে টান মারতে বিশেষ সময় লাগল না।
“এবার কী?” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে টুপ। সুহেল দুদিকে মাথা নাড়ল, জানে না। কিন্তু বুডঢা জানে, দরজা উঠে গিয়ে মরুভূমির মাঝে এখন বিশাল গর্ত। সেদিকে নিজের লম্বা লম্বা ধাতল আঙুলগুলো দেখিয়ে বলল, “নামো।”
টুপ অবাক, “বললেই হল? নামব কীভাবে, এ তো বিশাল বড় গর্ত।” কিন্তু বুডঢা ততক্ষণে টুংকে কোলে তুলে নামতে শুরু করে দিয়েছে। সুহেল বলল, “মনে হচ্ছে সিঁড়ি নেমে গেছে।”
টুপ ‘যাহ’ বা ‘দ্যুত’ ধরনের কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু ততক্ষণে ও-ও দেখে ফেলেছে শ্যাওলা ধরা সিঁড়ির সারি। একের পর এক লোহার সিঁড়ি নেমে গেছে, ওপর থেকে দেখা যাচ্ছে সেই সিঁড়ি ধরে বুডঢা নামছে, বুডঢার মাথার ওপরটা চকচক করছে আলো পড়ে।

টুপ নামল, সুহেলও। মিনিট পাঁচেক নেমেছে, হঠাৎ দুদ্দাড় শব্দ শুনে দেখে ঊর্দ্ধশ্বাসে বুডঢা ওপরের দিকে উঠে আসছে। টুংকে টুপের কোলে তুলে দিয়ে বলল “দাঁড়াও, দাঁড়াও, দাঁড়াও।” বলতে বলতেই নীচে প্রচণ্ড এক শব্দ। টুপের মাথা ঘুরছিল নীচের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু তার মধ্যেও দেখতে পেয়েছে প্রবল জলের তোড়। ঘোলা জলে অগুনতি জিনিস ভেসে আসছে, কিন্তু সেগুলো কী বোঝা যাচ্ছে না। দুপাশের দেওয়ালে প্রবল আক্রোশে সে জল আছড়ে পড়েছে। সুহেল কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল। আর ঠিক তক্ষুনি জলের প্রবল স্রোতে ভেসে এসে লাফিয়ে উঠল দুটো সাদা হাড়। ঠিক যেরকম হাড় আটকে ছিল লোহার দরজার ফাঁকে।
“সুহেল, দেখলি?” ধরা ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করল টুপ।
“দেখেছি। মনে হচ্ছে নীচে জলে শুধু হাড়গোড়ই ভেসে আসছে।”
বুডঢার কথায় ফের ওপর উঠে এল ওরা। আরও অনেকক্ষণ পর উঠে এল বুডঢা নিজেই। জানাল হিসেব করে দেখেছে প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর আসবে ওই ঘোলা জলের তীব্র স্রোত।
“নীচে তাহলে যাওয়ারই বা কী দরকার?”
রোবট কি হাসে? টুপের মনে হল বুডঢার চৌকো চৌকো চোখে একটা হাসির ঝিলিক। খনখনে গলায় জবাব এল, “গলগাথা।”

[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]

ছবি — পার্থপ্রতিম দাস

To Top