মূর্তিচোর সরল দে

জেঠুর সঙ্গে আর একটা লাইটপোস্ট ছাড়িয়ে টুবলু তখন স্টেশনের আরও কাছে। টুবলুর আগে আগে পা ফেলেছেন জেঠু। তাঁর গতি বাড়ছে। তবে কি? হ্যাঁ, ঠিক তাই! হুস করে এসে গেল ট্রেন। অমনই টুবলুর বুক ধড়াস-ধড়াস। টিকিট কাটাই যে হল না। ফসকে যাবে নাকি?

টুবলু তখন এমন ধড়ফড় করে ছুটলে যে, জেঠুকেই টপকে গেল ধাঁ করে। কিন্তু এ জেঠু দারোগাজেঠু। সঙ্গে সঙ্গে টুবলুর কান পাকড়ে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে দিলেন।
“গুরুজনকে ওভারটেক? এই শিক্ষা, ছি!” বলে টুবলুর কান ছেড়ে হাতে টান দিলেন জেঠু। তারপর তাকে একরকম টেনে-হিঁচড়েই নিয়ে গেলেন লাইনতলার আলো-অন্ধকারে। একফালি রাস্তায়।
আর ঠিক তখনই মাথার ওপর দিয়ে ঝমঝম করে চলে গেল বড় আশার ট্রেন।
“ও জেঠু, ট্রেন যে…”
“যাক। আমরা লাইনের ওপারে যাচ্ছি। তারপর তো পা বাড়ালেই গ্রাম।”
যাচ্চলে পা বাড়ালেই গ্রাম! তবে তো বেড়ানোর আসল মজাই মাটি। কিন্তু গ্রাম মানে তো অনেক দূর। যেমন পিসির বাড়ি জায়গ্রাম। ট্রেনে চেপেই তো গিয়েছিল সেবার। তাহলে?
তাহলে যে কী, জেঠুই তা জানেন। তাঁর পেছন পেছন মেঘলা মেঘলা মুখে লাইনতলা থেকে বেরিয়ে এল টুবলু। বেরোতেই, উরিব্বাস, কান ঝালাপালা। একসার রিকসার হর্ন বেজে উঠল প্যাঁক প্যাঁক করে। একটা আবার গড়িয়ে এল জেঠুর পায়ের গোড়ায়। টুবলু সেদিকে ঝুঁকতেই জেঠু তার হাত ধরে টান দিলেন।
“চলে আয়, পা-গাড়ি তো আছে।”
জেঠুর হ্যাঁচকা টানে টুবলুর একপাটি তখন পটাং! স্ট্রাপ ছিঁড়েছে! হাতে হাওয়াই সমস্যা নিয়ে বেচারা হতভম্ব। এখন উপায়? টায়ার ছাড়া পা-গাড়িই বা চলে কী করে?
জেঠু তো মারতে বাকি রাখলেন। হাওয়াই পায়ে কি হাওয়া খেতে বেরনো হয়েছে? এই শিক্ষা?
তবে শাপে বর হল। টুবলুকে নিয়ে রিকশায় উঠলেন জেঠু।
কিছুটা সিধে গিয়ে মস্ত একটা পাঁচিলের গা ঘেঁষে রাস্তাটা বাঁ দিকে ঘুরেছে। রিকশাও ঘুরল। আর তখনই জেঠু ‘এই রোখো, রোখো’ বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। রিকশা থামল।
ব্যস, হয়ে গেল? এখানেই নামতে হবে নাকি?
না। রিকশায় বসেই পাঁচিল-ঘেরা বিশাল বাড়িটার দিকে আঙুল উঁচিয়ে জেঠু বললেন, “ওই যে ই-এস-আর হাসপাতাল, আগে ওখানেই ছিল সেই আখখেত। আর ওই ওদিকে কলোনির ঘরবাড়ি, ওখানে ছিল চাঁদমারির ঢিপি। তারপর মেঠোরাস্তার দুদিকে ধু-ধু ধানখেত।”
স্থির দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে জেঠু যেন ফ্রিজ হয়ে গেলেন। তারপর নড়ে উঠে আপন মনেই বললেন, “কী ছিল আর কী হল!”
জেঠু কি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন? টুবলু অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকাল। এ যেন অন্য জেঠু। তাঁর গলার স্বরও অন্যরকম। ফের তিনি শুরু করলেন, “ছেলেবেলায় কতবার এখানে দলবেঁধে এসেছি আখ চুরি করতে। একবার…”
“তুমি চুরি করতে জেঠু?” মুখ ফসকে কথাটা বলেই ফেলল টুবলু।
“না, ঠিক চুরি নয়। এই এ্যাডভেঞ্চার আর কী।” বলে জেঠু সামলে নিলেন নিজেকে, “তবে হ্যাঁ, না বলে পরের জিনিস নিলে…”
নিলে যে কী হয় তা আর বলা হল না জেঠুর। তখনই পিপ পিপ করে একটা জিপ ব্রেক কষে থামল রিকশার গা ঘেঁষে। পুলিশের জিপ।
“গুড মর্নিং স্যার। এত সকালে এদিকে, কী ব্যাপার? জমির খোঁজে নাকি?”
বাংলায় সুপ্রভাত জানিয়ে জেঠু উত্তর দিলেন, “না না, ওসব নয়। আমরা গ্রামের দিকে যাচ্ছি ঢেঁকিদর্শন করতে।”
“ঢেঁকিদর্শন!”
বিস্মিত পুলিশ অফিসারের দিকে টুবলুকে এক পা ঠেলে দিয়ে জেঠু বললেন, “এই যে এক মূর্তিমান, আজ বাদে কাল একুশ শতকের দিকে পা বাড়াবে, একেই দর্শন করাতে নিয়ে যাচ্ছি।”
“তাই নাকি? বেশ গুড বয় মনে হচ্ছে।”
“হুঁ গুড বয়! এবার হাফ ইয়ার্লির বাংলা পরীক্ষায় খাতায় কী লিখেছে জানেন? শুনলে অবাক হবেন।” কবজি উল্টে ঘড়ি দেখলেন অফিসার। অবাক হওয়ার মতো সময় তাঁর হাতে নেই। কিন্তু জেঠুকে ঠেকায় কে? “ঢেঁকি সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত টীকা লিখতে দিয়েছিল। তা ও লিখেছে — ঢেঁকি স্বর্গের এক দেবী। নারদের অভিশাপে মর্তে নামেন। তারপর প্রায়ই তাঁকে সশরীরে স্বর্গে গিয়ে ধান ভানার গান করতে হত। বুঝুন কেমন গুড বয়!”
হো হো করে হেসে তখনই গম্ভীর হয়ে ‘সত্যিই তো খুব অন্যায়’ বলে সামলে নিলেন অফিসার। এই মানুষটিকে তিনি শ্রদ্ধা করেন। তাঁর সিনিয়র অফিসার ছিলেন। খুব দাপুটে আর সৎ অফিসার। কবে রিটায়ার করেছেন। পুলিশমহলে এখনও তাঁর নাম।
আবার ঘড়ির দিকে তাকালেন অফিসার।
“তা আপনারা?”
জেঠুর সৌজন্যমূলক প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ অফিসার হেসে বললেন, “আমরা যাচ্ছি ঘুঘু দর্শনে।”
দুজনের মধ্যে চোখে চোখে আরও কিছু কথা হল।
স্টার্ট নিল জিপ। অফিসার হাত নাড়লেন।
আর জেঠু ‘চলো’ বলতেই রিকশাও গড়িয়ে গেল সামনে। তারপর ছুটল সাঁই সাঁই করে।
মিনিটপাঁচেক পশ্চিমমুখো উজিয়ে রিকশার গতি কমে এল। সামনে তেমাথার মোড়। একটা রাস্তা ডান দিকে, আর একটা বাঁ দিকে।
“কোথায় যাবেন বাবু, নিশ্চিন্দা?” রিকশাওলা জানতে চাইল।
জেঠু বললেন, “যেদিকে ধানখেত আর বেশ গ্রাম-গ্রাম। আমি তো বহুকাল এদিকে আসিনি। তা প্রায় চল্লিশ বছর। বদলির চাকরি ছিল। বাইরে বাইরেই কেটে গেল। এখানেই তখন ধু-ধু ধানখেত ছিল দুধারে। কাঁচারাস্তায় ধুলো উড়ত। সব বদলে গেছে।”
“তবে তো আপনাদের শান্তিনগর, আনন্দপুর ছাড়িয়ে যেতে হবে বাবু।” বলে রকশাওলা বাঁ দিকে রিকশা ঘুরিয়ে দিল।
তারপর একসময় সত্যি সত্যিই ধানখেত দেখা গেল। তবে রাস্তার একধারেই। আর একধারে ফাঁকা মাঠ, ঘাসবন আর জলা জমি। পাশ দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ।
উল্লসিত জেঠু লাফ দিয়ে নামলেন রিকশা থেকে। টুবলুকেও নামালেন হাত ধরে। ভাড়া মিটিয়ে রিকশা ছেড়ে দিলেন। তারপর পাকারাস্তার ঢাল দিয়ে নেমে এলেন মাঠে। টুবলু কিন্তু নামতে গিয়ে গড়িয়ে গেল নীচে। জেঠু বললেন, “কেমন মজা?” ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল টুবলু। ভাবল, বেশ মজা তো।
পায়ে চলা রাস্তায় পা বাড়ালেন জেঠু। টুবলু তাঁকে অনুসরণ করল। তার অসুবিধা হচ্ছিল খালি পায়ে চলতে। খালি পা!
দুদিকের এক বুক ঘাস জঙ্গল ফুঁড়ে রাস্তাটা আবার উঠে গেছে উঁচু জমির ওপর। জেঠু উঠলেন ঢাল বেয়ে। টুবলু খুব সাবধান। উঠতেই দেখা গেল একটা ডোবা। তার ওদিকে ঘন বাঁশবন।
“ওই দ্যাখ, বাঁশঝাড়।” বলে ডোবার ধার দিয়ে এগিয়ে চললেন জেঠু। তাঁর পেছন পেছন যেতে যেতে টুবলু বাঁশবনের কটকট শব্দ শুনল। কেমন যেন ভুতুড়ে শব্দ। আর সে তাকায় ওদিকে?
এক বুড়ি এক বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে কাঠ কুড়াচ্ছিল বনে। জেঠু তাকেই প্রশ্ন করলেন, “ও বুড়িমা, এ জায়গাটার নাম কী?”
ঘাড় হেঁট করে নিজের কাজে ব্যস্ত বুড়ি উত্তর দিল, “ই তো হাতিবুড়ির জঙ্গল।”
হাতিবুড়ির জঙ্গল? উরিব্বাস! নাম শুনেই টুবলুর বুকে ধুকপুকানি। ঠিক তখনই একটা লোক সাঁ করে বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে। টুবলু চমকে উঠল। লোকটা হাঁটছে, না ছুটছে বোঝা গেল না। তার হাতে একগাছা মোটা দড়ি। জেঠু পেছু ডেকে তাকে থামাতে চাইলেন, “ও কর্তা, শুনছ?”
কর্তা কিন্তু থামল না। চলতে চলতেই বলল, “বলেন।”
“ওদিকে কোনও পাড়া আছে কিনা বলতে পারো?”
“তা আছে, ঢেঁকিপুকুরের ধারে।”
“তুমি তো ওদিকেই যাচ্ছ, তাই না কর্তা?”
“তা আজ্ঞে যাচ্ছি। আমার গরুটা আবার দড়ি ছিঁড়ে পালিয়েছে। দেখি ঢেঁকিপুকুরের পাড়ে চরে বেড়াচ্ছে কিনা।”
যাক, একজন গাইড পাওয়া গেছে। তার ছায়া মাড়িয়ে মাড়িয়ে জেঠু এগিয়ে চললেন। আর জেঠুর ছায়ায় টুবলু।
জঙ্গল ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে।
যেতে যেতে গাইডকে প্রশ্ন করলেন জেঠু, “আচ্ছা কর্তা, পুকুরের নাম তো বললে ঢেঁকিপুকুর। তাহলে ও পাড়ায় ঢেঁকি আছে, কী বলো।”
“ঢেঁকি?” জেঠুর উৎসাহের গোড়ায় জল ঢেলে লোকটা বলল, “সে ছিল আমার ঠাকুরমাতার কালে। কচিবেলায় দেখেছি বটে।”
“দেখাই যাক না।” জেঠুর মনে তবু ক্ষীণ আশা।
এমন সময় কিছু দূরে একটা পোড়োবাড়ি দেখা গেল। জঙ্গলের মধ্যে, গাছপালার আড়ালে। অনেকটা জায়গা জুড়ে। সে বাড়ির খিলান আছে তো দেওয়াল নেই, দেওয়াল আছে তো ছাদ নেই। জানলা-দরজা সব লোপাট। মাঝখানে মানুষ সমান ঘাসবন।
“ওটা কি জমিদারবাড়ি ছিল?” জেঠু জানতে চাইলেন।
“আজ্ঞে দশ-আনি রাজার বাড়ি। অনেককাল আগেই সব মরে-হেজে গেছেন। এক বুড়ি নাকি শোয়াশ বচ্ছর পেরমায়ু নিয়ে বেঁচে ছিল। একটা হাতিও কীভাবে বুড়িটার সঙ্গে টিকে গিয়েছিল। বুড়ি রোজ সন্ধেবাতি দিত শ্বশুরের ভিটেয়। চোখে তো দেখি নাই, শুনেছি।”
“তা এখন কেউ থাকে না?”
“কে থাকবে? কার এমন বুকের পাটা?”
“কেন?”
“আজ্ঞে তেনারা থাকেন। নাম করতে নাই। হাতিবুড়ির বাড়ি শুনলেই লোকে ভিরমি খায়।”
বাড়িটার কাছে আসতেই হঠাৎ ধুপ ধুপ শব্দ শোনা গেল। শব্দটা ভেতর থেকেই আসছে।
কান খাড়া করে জেঠু থমকে দাঁড়ালেন, আবার শুনলেন।
ধুপ ধুপ ধুপ… একটানা শব্দ।
“টুবলা শুনছিস? ঢেঁকির শব্দ।”
টুবলু শুনবে কী? বেচারা সেখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচে। কিন্তু জেঠু যেন কী! সেই ভুতুড়ে শব্দটাই যেন বেশি করে শুনতে চাইছেন।
জেঠুর গাইডও তখন ‘আমার গোরুটা’ বলে লম্বা দিতে চাইল। কিন্তু এ সময় গাইড পালাবে, তা কি হয়? জেঠু অমনই খপ করে তার হাত চেপে ধরলেন, “অত ব্যস্ত কেন? দাঁড়াও, তোমার সঙ্গে আমরাও যাব গোরু খুঁজতে।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও লোকটাকে থামতে হল।
তারপরে একলাফে পাঁচিল টপকে জেঠু লাফিয়ে পড়লেন একবুক ঘাসজঙ্গলে। কী দুঃসাহস! ভাঙা পাঁচিলের এদিকে দাঁড়িয়ে টুবলু তো ভয়ে কাঁটা। গাইডের মুখে অস্ফুটে ‘রাম রাম।’
জেঠু এক পা এগোতেই ষণ্ডামার্কা একটা লোক হঠাৎ জঙ্গল ফুঁড়েই যেন রুখে দাঁড়াল। “এখানে কী চাই?”
“আমরা ঢেঁকি দেখতে চাই।”
“ওসব ফালতু জিনিস এখানে নেই। ভালো চান তো জলদি ভাগুন এখান থেকে।”
জেঠু লোকটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে চাপা গর্জনের মতো একটা শব্দ করলেন, “হুম!” এককালের ডাকসাইটের পুলিশ অফিসার। এমন অনেক দেখেছেন।
টুবলু সভয়ে লক্ষ করল, লোকটার হাতে একটা শাবল।
জেঠু আর এক পা এগিয়ে বললেন, “কে হে তুমি? তোমার কথায় ভেগে যেতে হবে নাকি? রাস্তা ছাড়ো।”
টুবলু দেখল জেঠুর ডানহাত তাঁর পাঞ্জাবির পকেটে। ওই পকেটে যে কী থাকে তা টুবলু ছাড়া আর কে জানবে?
জেঠু আরও এক পা সামনে বাড়াতেই লোকটা অমনি ধাঁ করে শাবলটা উঁচিয়ে ধরল মাথার ওপর, “খবর্দার!” আর জেঠুও তখনই পকেট থেকে ঝট করে রিভলবারটা বের করেই তাক করলেন তার দিকে, “হুঁশিয়ার, আর এক পা নড়েছ যদি…”
এতটা ভাবতে পারেনি ষণ্ডামার্কা লোকটা। তার হাত থেকে খসে পড়ল শাবল।
জেঠুকে তখন অরণ্যদেব বলেই মনে হল টুবলুর। ইস, জেঠুর আদরের সেই রোডসেশিয়ান কুকুরটা যদি এখন সঙ্গে থাকত।
কিন্তু সে নিজে একটা কী? ছি, এই কী তার শিক্ষা? এতদিন হেভিদার ক্লাবে তা হলে কীসের প্র্যাকটিস? সে কি একটা ভিতুর ডিম? না, সে দারোগা জেঠুর ভাইপো। এই ভেবে টুবলু টিনটিন হয়ে গেল। ঝাঁপিয়ে পড়ল পাঁচিল টপকে। তারপর মুহূর্তেই এক মোক্ষম প্যাঁচ। স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আস্ত একটা ডাকাত তখন কাটা কলাগাছের মতন লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
জেঠু বললেন, “শাববাশ!”
কাত হয়ে রিভালবারের দিকে হাত বাড়াতে যাচ্ছিল শয়তানটা। সঙ্গে সঙ্গে তার কপালে রিভালবারের নল ঠেকিয়ে জেঠু ফের একবার ‘হুম’ বলে উঠলেন।
ঠিক তখনই পেছনের ঝোপঝাড় থেকে উঁকি মারল আর এক মূর্তিমান। কিছু একটা ঝামেলা বেধেছে এতক্ষণে টের পেয়েছে বোধ হয়। “কী হল গুরু?” বলেই সে সামনের সেই দৃশ্য দেখে পলকে ঘুরেই ফের সেঁধিয়ে গেল জঙ্গলের মধ্যে। দুদ্দাড় করে তার ছুটে পালানোর শব্দ শোনা গেল। আর জেঠুর গাইড তখন বিকট চিৎকার জুড়ে দিল, “ডাকাত! ডাকাত! বাঁচাও…” বাপ রে! আর সে থামে না।
তার চিৎকার শুনেই আশপাশ থেকে ছুটে এল একদল লোক। তাদের হাতে হাতে দা আর কুড়ুল। খুব সম্ভব গাছ কাটার দল।
জেঠু তখন বললেন, “একটা পালিয়েছে। তবে এটাই দলের পাণ্ডা। পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলো বদমাশটাকে। আর, কেউ একজন থানায় ফোন করে দাও।”
একজন বলল, “এখানে টেলিফোন পাবেননি হুজুর। কিন্তু একটুকুন আগে পুলিশের গাড়ি দাঁইড়ে ছেল পঞ্চাত আপিসের সামনে। এখনও আছে হয়তো।”
তো, দুজন ছুটল পুলিশ ডাকতে।
জেঠুর গাইডের হাতে দড়ি ছিল। বেশ মোটা আর লম্বা। সেটা দিয়েই বেঁধে ফেলা হল ডাকাতসর্দারকে।
গাইড বলল, “কিন্তুক আমার গোরু…”
জেঠু ধমক দিলেন, “তোমার গোরু কি পালাচ্ছে? চিন্তা নেই, পুলিশ এলে দড়ি ফেরত পাবে।”
পুলিশ এল, জিপ পাকা রাস্তায় রেখে বন্দুক উঁচিয়ে হেঁটে।
সেই পুলিশ অফিসার।
জেঠু এতক্ষণ রিভালবার হাতে পাহারা দিচ্ছিলেন। চারদিকে তাঁর সতর্ক দৃষ্টি। বলা যায় না, পালিয়ে যাওয়া লোকটা ফিরে আসতে পারে। পুলিশ আসায় তিনি নিশ্চিন্ত। বন্দিকে অফিসারের হাতে সঁপে দিয়ে বললেন, “এই আপনার ঘুঘু। দর্শন করুন।”
তারপর হাতিবুড়ির বাড়ি তল্লাশি হল।
ভেতরে ঝোপের পাশে একটা দুরমুশ দেখে অফিসার ঝুঁকে পড়লেন সেখানে। পাশে সদ্য খোঁড়া একটা গর্ত মাটি দিয়ে চাপা। দুরমুশ চালিয়ে সমান করা হচ্ছিল মাটি।
“তাই ধুপ ধুপ শব্দ হচ্ছিল।” জেঠু বললেন।
টুবলু বলল, “এই তা হলে ঢেঁকি?”
কেউ তার কথায় কান দিল না। সকলের নজর তখন গর্তের দিকে। শাবল তো ছিলই। সেটা দিয়ে আবার নতুন করে খোঁড়া হল গর্ত।
আরে ওটা কী?
একটা বস্তা। আর ভেতরে বড়ো একটা পলিথিনের প্যাকেট। আর প্যাকেট থেকে যেটা টেনে বের করা হল, সেটা দেখেই পুলিশ অফিসার যেন লাফিয়ে উঠলেন, “ইউরেকা! এই তো সেই প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি। কদিন আগে রতনপুরের মন্দির থেকে উদ্ধার হয়েছিল। আশ্চর্য! এটার খোঁজেই তো আমরা চতুর্দিকে তোলপাড় করে বেড়াচ্ছি।” বলে কৃতজ্ঞ অফিসার জেঠুর দিকে হাত বাড়ালেন। হ্যান্ডশেক করে বললেন, “ঢেঁকি তা হলে স্বর্গে গিয়েও ধান ভানে!”
জেঠু হাসলেন।
সব তো হল। কিন্তু টুবলুর ঢেঁকিদর্শন?
তাও হল। পুলিশবাহিনীকে বিদায় দিয়ে জেঠু সেই গোরু-খোঁজা লোকটার হাতে দড়ি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, “চলো হে কর্তা, এবার ঢেঁকিপুকুরের দিকে চলো। তোমার গোরুটাকে বেঁধে আনি।”
মূর্তিচোরকে পুলিশ হ্যান্ডকাফ দিয়ে নিয়ে গেছে। টুবলুকে নিয়ে জেঠু চললেন গোরুটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে আনতে।
পুকুর নয়, দিঘি। প্রকাণ্ড। পাড়ে ঘাসবন। মহানন্দে ঘাস চিবুচ্ছিল গোরুটা। দড়ির ফাঁস লাগিয়ে তার গলায় মালার মতো পরিয়ে দিলেন জেঠু। তিনি কথা রাখলেন। গোরুর মালিক তখন বলল, “নেতান্তই যদি ঢেঁকি দেখতে চান হুজুর, তো ঘাটলায় চলেন।”
পুকুরঘাটে একটা পেটমোটা লম্বা কাঠ। শ্যাওলা ধরা। কতকাল যে ওখানে পড়ে আছে কেউ জানে না। এককালে ঢেঁকি ছিল। এখন ঘাটের পৈঠা।
জেঠু বললেন, “টুবলু দেখছিস?”
টুবলুর জোড় হাত কপালে ঠেকল।

ছবি – সুমিত রায়

To Top