মৃত্যুর গন্ধ অভীক দত্ত

“দাদা আপনি কখনও মৃত্যুর গন্ধ পেয়েছেন?”

আমার কাছে ঘেঁষে এসে ফিসফিস করে বলল লোকটা। লোকটার গায়ে কী রকম একটা বাসি গন্ধ। মুখে কাঁচা পাকা দাড়ি। জামাকাপড় অবশ্য বেশ ধোপদুরস্ত। প্যান্ট শার্ট।
ইন্টার সিটি করে যাচ্ছি। রাত আটটা নাগাদ ট্রেনটা কোনও এক আজানা কারণে তালিত স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। যাব আসানসোল। বন্ধুর বিয়ে খেতে। একাই এসেছি। আর কোনও বন্ধুই যেতে রাজি হল না। বিভিন্ন কারণে পাশ কাটিয়ে গেছে। আসলে রবিবারগুলো কে-ই বা আর নষ্ট করতে চায়। কিন্তু আমায় যেতেই হবে। এক মেসে থাকতাম। অনেক সুখ-দুঃখের সাথি এই বন্ধুটি। ঠিক করেছি রাতটা আসানসোলে থেকে পরের দিন ভোরবেলা বিধান ধরে কলকাতা ফিরব। যাক গে, এই ঘটনায় বন্ধু কিংবা তার বিয়ে বড় কথা না। লোকটার কথায় ফিরে আসি।
আমি তার প্রশ্নে খানিকটা অবাকই হলাম। ভদ্রলোক বর্ধমানে উঠেছেন। এতক্ষণ কোনও কথা বলেননি। বার দুয়েক চা কিনে খেয়েছেন। এখন হঠাৎই মৃত্যুর গন্ধ পেয়েছি কিনা জানতে চাইছেন।
আমি কি জবাব দেব বুঝলাম না। শেষে বললাম “না। মৃত্যুর গন্ধ হয় নাকি?”
লোকটা আগ্রহী মুখে হাসল। বলল “হয়। কেন হবে না? একটা লেবু মেশানো ফিনাইল ফিনাইল গন্ধ থাকে।”
আমি এমনিতেই ওই প্রশ্নে হকচকিয়ে গেছিলাম। তারপর এই ফিনাইল-ফিনাইল গন্ধ শুনে কী বলব বুঝে উঠতে পারলাম না। বললাম “ফিনাইলের গন্ধ কিন্তু হাসপাতালেও থাকে। আপনি হাসপাতালে কি কাউকে মারা যেতে দেখেছেন? তাহলে সেই গন্ধটা হয়তো আপনার মনে গেঁথে আছে।”
ট্রেনটা ছাড়ার নাম করছে না। সেকেন্ড সিটিংয়ে যাচ্ছি। তিনটে সিট পরপর। লোকটা জানলার ধারে বসে। এমনিতেই এইসব ট্রেনে মাঝের সিটে বসা অস্বস্তিকর একটা ব্যাপার। তার ওপর এরকম কথাবার্তা। রিজার্ভড সিট, নইলে অন্য কোথাও গিয়ে বসতাম। ট্রেন একেবারে ভর্তি। একটা সিটও খালি নেই।
লোকটা তেমনই ফিসফিসে গলায় বলল “হাসপাতালে না। আমার বাড়িতেই দেখেছি। বেশ কয়েকবার। আমাদের গ্রামে বাস। বর্ধমান স্টেশন থেকে নেমে বাস ধরে ঘণ্টা দেড়েক লাগে। এই সেদিন হল ইলেক্ট্রিসিটি এসেছে। তখন আমি বেশ ছোট। বারো-তেরো বছর বয়স, ঠাকুরদা সুস্থই ছিলেন। বাড়িভর্তি লোক। আমার ঠাকুরদার সাথে খুব ভাব ছিল। নোনতা বিস্কুট দিত যখনই যেতাম। একদিন খেলে এসে ঠাকুরদার ঘরে গিয়ে দেখি ঘরময় ফিনাইলের গন্ধ।
“আমি ঠাকুরদাকে বললাম, ‘তোমার ঘরে কি ফিনাইল দিয়েছে?’ ঠাকুরদা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ফিনাইল কেন দেবে? কিছুক্ষণ আগে কড়া ধুপ দিয়ে গেছে। তুই আবার ফিনাইলের গন্ধ কোত্থেকে পাচ্ছিস?’ আমি মানলাম না। কিছুক্ষণ গোঁজ হয়ে বসে থেকে ঘরে চলে এলাম। ঘরে এসে দেখি সেই গন্ধটা উধাও। মাকে বলতে মাও বলল, ফিনাইল দেয়নি বাড়ির কোথাও। তখন শীতকাল। সাপখোপের উপদ্রবও নেই যে কার্বলিক অ্যাসিড কোথাও ছড়ানো হবে। যাই হোক। পড়তে বসলাম। তখন আমাদের স্কুলে ইতিহাস পাতার পর পাতা মুখস্থ ধরত। না পারলেই পিঠের উপর বেতের বাড়ি। পিঠ ছাড়িয়ে পায়ে, হাতেও পড়ত কোনও কারণ ছাড়াই।”
ট্রেনটা নড়ে উঠল। এতক্ষণে ছাড়ল। ভদ্রলোক বাইরের দিকে তাকিয়ে আবার বলতে আরম্ভ করলেন, “এখনও কী পড়েছিলাম মনে আছে বুঝলেন। কারণ আমার সে দিনটার কথা পরিষ্কার মনে আছে। জোরে জোরে শব্দ করে ইতিহাস পড়ছি। ইউরোপের শিল্প বিপ্লব কী ও কেন। হঠাৎ শুনি একটা কিছু পড়ার শব্দ। বাড়িভর্তি লোক। শব্দটা ঠাকুরদার ঘর থেকেই এসেছে বুঝতে পেরে সবাই সেদিকে ছুটল। আমিও ছুটলাম। গিয়ে দেখি ঠাকুরদার বুক ধরে পড়ে গেছেন ঘরের মধ্যে। সাড়াশব্দ নেই। সেদিন কোনও কারণে এক পিসি এসেছিল আমাদের বাড়িতে। ঠাকুরদাকে জোরে জোরে ডাকতে লাগল। তারপর কান্না শুরু। ঘণ্টাখানেক পরে ডাক্তার এসে চেক করে বললেন হার্ট অ্যাটাক। একফোঁটাও সময় দেয়নি। আমার ঠাকুরদার আশির ওপর বয়স হলেও খুব ফিট ছিলেন। এভাবে চলে যাবেন কেউই বুঝতে পারেনি। বাড়ির সবাইকে আগলে রাখতেন। মৃত্যুটা আমাকে বেশ নাড়িয়ে দিয়ে গেছিল। তখন সন্দেহ হয়েছিল বটে, কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় আর গ্রামের সব মানুষ যেহেতু ভেঙে পড়েছিল আমাদের বাড়িতে, সে কারণে সেই গন্ধটা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করিনি।
“এর পরে মাধ্যমিক দিয়েছি। মাধ্যমিকের পরে আমাদের প্রায় আড়াই মাস ছুটি থাকত। সে সময়ে মামার বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। সেই যে কথা আছে না, মামার বাড়ি ভারী মজা, কিল চড় নাই। মাঠে ঘাটে মামাতো ভাইদের সাথে সারাদিন ধরে পড়ে আছি। এই খেলা চলছে তো ওই চলে গেলাম পুকুরপাড়ে মাছধরা দেখতে। তা এরকম মজার মধ্যেই একদিন আবার সেই গন্ধটা পেলাম। মামার বাড়িতে। তখন খেতে বসেছি। মামার বাড়িতে টেবিল চেয়ার ছিল না। সব মামাতো ভাইয়েরা মিলে একসাথে মেঝেতে খেতে বসত। মামী ওখানেই খাবার দিতেন। সেদিন খেতে বসেই আমি সেই লেবু মেশানো ফিনাইলের গন্ধটা পেলাম।”
লোকটা এতটা ফিসফিস করে বলছিলেন যে আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। আমি তাকে থামিয়ে বললাম “একটু জোরে বলা যায় না?”
লোকটা হাসলেন “না। লোকে পাগল ভাবতে পারে। আপনাকে দেখে সিরিয়াস লোক বলে মনে হয়।”
আমি একটু অবাক হলাম। কোনদিক থেকে আমাকে সিরিয়াস ভাবলেন বুঝে উঠতে পারলাম না। ভদ্রলোক বলতে লাগলেন “গন্ধটা পেতেই মামীকে বললাম। মামী অবাক হয়ে বললেন, ‘না তো। খামোখা ফিনাইল দিতে যাব কেন?’ আমি আর কিছু বললাম না। খেয়ে নিলাম। কিন্তু গন্ধটা আমাকে ধাওয়া করে যেতে লাগল। আমার মেজো মামার ছেলে ভোম্বল, ওর চেহারাও ভোম্বলের মতো। ভীষণ মোটা, শরীরে চর্বি একেবারে গিজগিজ করছে বুঝলেন। ওর খাওয়া শেষ হয় সবার পরে। মামার বাড়িতে মুখ হাত ধুতে যেতে হয় বাইরের টিউবওয়েলে। আমরা মুখ হাত ধুয়ে ঘরে ফিরতে ভোম্বলের খাওয়া শেষ হল। হেলতে দুলতে মুখ ধুতে যাচ্ছে, একটা জাত খরিশের লেজে পা দিয়ে বসল। এক সেকেন্ড সময় দিল, না পায়ে ছোবল। ভোম্বলের চেঁচামেচি শুনে সবাই দৌড়ে গেলাম। মামী তো দেখেই অজ্ঞান। মামারা সব দোকানে। বাজারে বড় দোকান মামাদের। তাদের খবর দিয়ে এনে, বাঁধন ইত্যাদি দিয়েও ভোম্বলকে বাঁচানো গেল না। মামাবাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এল। ভোম্বলকে আমরা কত জ্বালাতন করতাম, কিন্তু বড্ড ভালোমানুষ ছিল। আমাকেও খুব ভালবাসত। খুব মন খারাপ হল।
“আর সেদিনই বুঝতে পারলাম ওই লেবু মেশানো ফিনাইলের গন্ধটাই মৃত্যুর গন্ধ। ওই গন্ধটা আমি আগেভাগেই পেয়ে যেতাম। কিন্তু তখন আমার একটু বুদ্ধি পেকেছে। বুঝলাম এই ব্যাপারটা কাউকে বলা যাবে না। বললে আমাকে পাগল-ছাগল ভেবে বসতে পারে।”
ভদ্রলোকের কথায় আমার কী রকম গা ছমছম করে উঠল। ট্রেন দুর্গাপুর স্টেশন ঢুকল। চাওয়ালা ওঠায় ভদ্রলোক আবার চা নিলেন। আমাকেও খাওয়াতে চাইলেন, তবে আমি নিলাম না।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভদ্রলোক বললেন “আমার গল্পটা কি আপনার আজগুবি লাগছে?”
আমার তো সেরকমই লাগছিল কিন্তু সেটা আর মুখে বলি কী করে! হেসে বললাম “না, না। এরকম তো হতেই পারে। কারও কারও এরকম সুপারন্যাচারাল পাওয়ার থাকে বলে শুনেছি বটে।”
ভদ্রলোক চায়ের কাপটা জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে ফেলে দিয়ে বললেন “এরপরে একদিন আমার বাবা হাসপাতালে ভর্তি হলেন। আমার আঠারো বছর বয়স তখন। আমাদের বাড়িতে এর আগে কেউ হাসপাতালে গেলেও আমাকে যেতে হয়নি। কিন্তু বাবাকে যখন প্রচণ্ড জ্বরে হাসপাতালে ভর্তি করতে হল, তখন তো আমাকে যেতেই হল। হাসপাতালে গিয়ে বুঝলেন আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসতে লাগল। এত গন্ধ চারদিকে। এমনিতেই সেখানে ফিনাইলের গন্ধে ভরপুর থাকে। কিন্তু সেই লেবু মেশানো ফিনাইলের গন্ধটা যেন একেবারেই আলাদা। আমি সেই গন্ধটাই বারবার পেতে লাগলাম। আমার বাবাকেও আর সে যাত্রা ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালেই মৃত্যু হয় তার।
“ভীষণ আপসেট হয়ে পড়লাম। কিন্তু আপসেট হয়েও উপায় কী। গোটা সংসারের ভারটা এসে পড়ল আমার কাঁধে। এখানে সেখানে দৌড়ে দিন কেটে যেতে লাগল। কলেজে পড়ছি, কলেজ থেকে এসে সারা সন্ধে টিউশনি করতে ছুটছি, দেখতে দেখতে বড় হয়ে উঠলাম।”
ট্রেন দুর্গাপুর ছাড়ল। ভদ্রলোক একটু থেমে আবার শুরু করলেন “আমি এখন আসানসোলেই থাকি। ওখানে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করি। এই চাকরি করছি বছর দশেক হল। তার আগে বি কম পাশ করার পরে কলকাতায় এক অফিসে চাকরি করতাম। বর্ধমান স্টেশনে সাইকেল রেখে সেখান থেকে ট্রেনে করে ডেলি প্যাসেঞ্জারি। সারাদিন পরে রাতে ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়ি ফিরতাম। লাইফ বলে কিছু ছিল না। একদিন অফিসে কী মনে হল, এক কলিগকে গল্পচ্ছলে এই ফিনাইলের গন্ধের ব্যাপারটা বলে ফেললাম। সেদিন থেকে অফিস করা আমার মাথায় উঠল। আমার নাম হয়ে গেল ফিনাইল বাবু। একদিন এমনকী আমার বস পর্যন্ত আমাকে ডেকে গম্ভীর গলায় বলে বসলেন, ‘দেখুন তো উৎপলবাবু আমার গা থেকে কোনও ফিনাইলের গন্ধ আসে নাকি।’ ঠাট্টা ইয়ার্কি বেশি পাত্তা না দিলে বেশিদিন টেকে না। আমি কদিন ওই ফাঁদে পা না দিয়ে বুঝলাম বাকিরাও ধীরে ধীরে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। এর মধ্যে অফিসে নতুন খোরাক এসে গেছে। সৌভাগ্যবশত আমিও ছাড় পেয়ে গেলাম। কিন্তু…”
ভদ্রলোক থামলেন। আমি উৎকণ্ঠিত হয়ে বললাম “অফিসেও পেলেন একদিন গন্ধটা?”
ভদ্রলোক ম্লান হাসলেন, “হ্যাঁ। সেদিন ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা জারি হয়েছে। বাড়িতে খবর দিয়ে অফিসেই রাতটা কাটানোর ব্যবস্থা করছি বিকেলবেলা, চারদিকে আকাশ কালো হয়ে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এমন সময়ে সেই গন্ধটা প্রবলভাবে ফিরে এল। আমি অসতর্ক হয়ে আমার এক কলিগ সান্যালকে বলেই ফেললাম, ‘হ্যাঁ রে, এখানে কি কিছুক্ষণ আগে ফিনাইল দিয়ে ঘর মোছা হয়েছে?’ ব্যস! কথাটা বলেছি কি, আবার অফিসময় ইয়ার্কি শুরু হয়ে গেল। এমনিতেই ঝড় ইত্যাদির জন্য কাজকর্ম শিথিল ছিল সেদিন, সবাই আমাকে নিয়ে পড়ল। আর এই করতে করতেই আমার এক কলিগ পলাশ সাঁতরা, হাসতে হাসতেই তার নাকমুখ দিয়ে রক্ত উঠে এল। পরে শুনেছিলাম সেটা ছিল তার সেকেন্ড স্ট্রোক। মুহূর্তের মধ্যে অফিসের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি লাফালাফি শুরু, অ্যাম্বুলেন্স ডেকে কাছের নার্সিং হোমেও নিয়ে যাওয়া গেল না। সেদিনের পর অফিসের চেহারা একেবারে বদলে গেল। সবাই আমাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল আর আমিও বুঝে গেলাম এই অফিসে আমার আর থাকা যাবে না, তারপরেই আসানসোলে অনেক কম মাইনের চাকরি হলেও চলে এলাম।”
ভদ্রলোক এই অবধি বলে চুপ করলেন। প্রায় মিনিট পাঁচেক কোনও কথা বললেন না। আমি নিজে থেকেই বললাম এরপর। “তারপর? তারপরও গন্ধ পেয়েছেন?”
ভদ্রলোক একবার বাইরের দিকে তাকিয়ে তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন “তারপরেও বার পাঁচেক। প্রতিবারই অব্যর্থ। কিন্তু আমি কাউকে কিছু বলিনি। আজ কেন জানি না আপনাকে দেখে মনে হল বলে ফেলি সব কথা। হালকা হলাম খানিকটা বলতে পারেন।”
আমি বললাম, “কোনওদিন কোনও মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলেছেন?”
ভদ্রলোক আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে বললেন, “প্রয়োজন বোধ করিনি।”
আমি একটু অস্বস্তিতে পড়লাম। মনে হয় উনি বুঝেছেন আমি ওঁকে একটু ‘ইয়ে’ ভাবছি। কথা ঘোরানোর জন্য বললাম, “আজকে আসানসোলে যাচ্ছেন কেন? আজ তো রবিবার?”
ভদ্রলোক হাসলেন, “আমাদের অফিসে ওইসব রবিবার বলে কিছু হয় না দাদা। আজ নাইট ডিউটি আছে।”
ট্রেন রানিগঞ্জ পৌঁছল। ভদ্রলোক আর আমার সঙ্গে কোনও কথা বললেন না। ঘাড়-টাড় শক্ত করে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
আমিও আর বেশি ঘাঁটালাম না। ভদ্রলোকের চোখের চাহনিটা একটু কেমন যেন। পাগলাটে ভাব আছে।
ট্রেন আর কিছুক্ষণ পরেই আসানসোল পৌঁছাবে। ট্রেনের বাকিদের মধ্যে একটা নামার তাড়াহুড়ো লক্ষ করলাম। আমার ব্যাগটা মাথার উপরে ব্যাগ রাখার জায়গায় রাখা। আমি উঠে ব্যাগটা কোলে নিয়ে বসলাম।
ভদ্রলোক হঠাৎ চমকে আমার দিকে তাকালেন। আমি বললাম, “কিছু বলবেন?”
ভদ্রলোক আমার ডানহাতটা শক্ত করে ধরে সেই ফিসফিস অথচ উত্তেজিত স্বরে বললেন, “বিশ্বাস করুন দাদা, আমি সেই গন্ধটা আবার পাচ্ছি। এই হঠাৎ করে গন্ধটা নাকে এল আমার।”
আমি খানিকটা শিউরে উঠলাম ভদ্রলোকের কথা শুনে। সেকেন্ড দশেক নিজেও গন্ধটা শোঁকার চেষ্টা করলাম, কিন্তু সেরকম কোনও গন্ধ পেলাম না। ভদ্রলোক আবার অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
আর আমার কেন জানি না এই ভিড় ট্রেনেও হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে লাগল। তবে কি এবার আমার পালা?
কিছুক্ষণ বসে ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জানি না, আবার কার কপালে মৃত্যু ঘনিয়ে এল। চলুন দরজার ধারে গিয়ে দাঁড়াই, নইলে এরপরে বেশ ভিড় বেড়ে যাবে।”
আমার অবস্থা বেশ শোচনীয়। পাংশুটে মুখে বসে রয়েছি। ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর ব্যাগটা নিয়ে এগোতে লাগলেন দরজার দিকে।
ট্রেন স্টেশনে ঢুকবে এরপরে বোঝা যাচ্ছে, এতক্ষণ জানলার বাইরের অন্ধকার বা দূরে কোথাও টিমটিমে আলো থেকে আস্তে আস্তে একটা আলোর শহরে প্রবেশ ফুটে উঠছে, আমিও উঠে দরজার দিকে এগোচ্ছি, আর মিনিট তিনেক পরেই স্টেশন আসবে মনে হচ্ছে, এমন সময় বিস্ফারিত চোখে দেখলাম, ভদ্রলোক ট্রেনের দরজা খুলে বাইরে প্ল্যাটফর্ম কোনদিকে দেবে দেখতে গেছেন আর দরজার গোড়ায় কলার খোসা না কি পড়েছিল, পা ফসকে এক্কেবারে ট্রেনের বাইরে।
ট্রেনের মধ্যে একটা হই হই রব উঠল, একদল চেন টানতে গিয়ে দেখল ট্রেন এমনিতেই ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা শুরু করেছে।
ঠিক সেই সময়ে আমি কোত্থেকে একটা লেবু মেশানো ফিনাইলের গন্ধ পেলাম।

ছবি – সুমিত রায়

To Top