মেঘরৌদ্রের খেলা দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

“দিদিভাই— এই দিদিভাই— উঠবি না?” সৌম্য চাদর ধরে টানাটানি করছিল।
“উঁ—” সাড়া দিয়ে টুকি পাশ ফিরে পাশবালিশটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আশ্বিনের মাঝামাঝি। শেষরাতের দিকে শিরশিরে ঠান্ডা পড়ে যায় আজকাল। মুড়িশুড়ি দিয়ে ঘুমোতে আরাম লাগে।
সৌম্য অবশ্য নাছোড়বান্দা। বাইরে থেকে একটি-দুটি করে পায়ের শব্দ আসছে। তাদের উঠোন পেরিয়ে উত্তরে শিবুদের বাগানের দিকে চলেছে। তাই শুনতে পেয়ে আর তর সইছে না তার। ফের দিদির গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, “ও দিদিভাই, ওঠ না। সবাই চলে গেল যে! এরপর একটা ফুলও যে পড়ে থাকবে না আর!”

টুকি আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। আধো অন্ধকারে জ্বলজ্বলে চোখ মেলে সৌম্য তার দিকে তাকিয়ে আছে। ঘুমের মধ্যে মা একবার নড়ে উঠে পাশ ফিরে শুলেন। হাত বাড়িয়ে সৌম্যকে খুঁজছেন। ভাই আবার কী একটা বলতে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি তার মুখে হাত চাপা দিয়ে টুকি ফিসফিস করে বলল, “চুপ। মা নড়ছে ওই দ্যাখ। জেগে গেলে বেরোতে দেবে না—” বলতে বলতেই তাড়াতাড়ি নিজের পাশবালিশটা তুলে নিয়ে মায়ের হাতের মধ্যে গুঁজে দিল টুকি। বালিশের গায়ে তখনও কুসুম-কুসুম ওম লেগে আছে। সেটাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমের মধ্যেই কী যেন বিড়বিড় করে বলে মা ফের চুপচাপ হয়ে গেলেন। একটু বাদে নিশ্চিন্ত হয়ে টুকি বলল, “নে, হয়েছে। চল এবারে।”
ঘরের দরজা টেনে দিয়ে বারান্দার পেরেকে ঝোলানো সাজিটা টেনে নামাতে নামাতে সৌম্য গজগজ করছিল, “সেই কখন থেকে তোকে ডাকছি বল তো দিদিভাই! আজ আর স্থলপদ্ম একটাও পাব না। শিউলিও পাব না। সেই কোন ভোর থেকে ওরা সব উঠে শিবুদের বাগানে গিয়ে ঢুকেছে জানিস!”
টুকি মাথা নেড়ে হেসে বলল, “আজ শিবুদের বাগানে যাব তোকে কে বলল?”
“তাহলে?”
“সে যাব এক জায়গায়। শিউলি গাছের জঙ্গল হয়ে আছে দেখবি। স্থলপদ্ম গাছও আছে দুটো। তাতে এই এত বড় বড় ফুল। কেউ তোলে না।”
সৌম্য একটু অবাক হয়ে বলল, “কোথায়?”
“চল দেখাচ্ছি। কাল বিকেলে আমি গিয়ে চুপিচুপি ঘুরে দেখে এসেছি একবার।”
“বিকেলে তো আমরা মাঠে খেলছিলাম সবাই মিলে। তুই আবার গেলি কখন?” সৌম্যর গলায় সন্দেহের ছাপ।
“গেছিলাম। তোরা টেরই পাসনি। ‘আশপাশ’ খেলবার সময় আমাকে কেউ খুঁজেই পাচ্ছিল না কেন বল দেখি? আমি তো তখন লুকোবার নাম করে— হি হি—” কথা বলতে বলতে বাঁশের বেড়ার গেটটা সাবধানে খুলে পথে নেমে এসেছে দুই ভাইবোন। তারপর দক্ষিণ মুখে ছুট-ছুট— পুকুরের পাড় দিয়ে সরু পথ। বর্ষার দাপটে তা একেবারেই ধুয়ে গিয়ে পাশের বাঁশঝাড়ের গা অবধি এসে গিয়েছে পুকুরের জল। সেসব জায়গাগুলো সাবধানে কঞ্চি ধরে ধরে বাঁশগাছের ফাঁক দিয়ে দিয়ে এগোতে হয়। সেখানে অন্ধকার এখনও দলা পাকিয়ে রয়েছে। গা ছমছম করছিল সৌম্যর। ক্ষীণ গলায় সে ডাকল, “দিদিভাই!”
টুকি আগে আগে যাচ্ছিল। এই বনজঙ্গলের রাস্তা তার হাতের তেলোর মতন চেনা। মুখ না ঘুরিয়েই বলল, “ভয় পাস না। রাম-রাম করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আর, আমরা তো ভালো কাজের জন্য যাচ্ছি, বল! মা দুগ্‌গার পুজোর ফুল তুলে আনব। মা দুগ্‌গা কেমন খুশি হবে তাই ভাব! তাহলে আর আমাদের ভয় কী?” বলতে বলতে ডানদিকে ঘুরে পুকুরের ধার ছেড়ে বাঁশবনের গভীরের দিকে পা বাড়াল টুকি। সৌম্যর পা আর এগোয় না। বনের মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে পড়ে সে ভয়ে ভয়ে ফের ডাকে, “ও দিদিভাই, ওদিকে তো জটেশ্বরীর থান! ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস?”
টুকি থেমে পড়ে চোখ পাকিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল, “ওইখানেই তো যাচ্ছি। তোর ভয় লাগে তো তুই বাড়ি ফিরে যা।”
সৌম্য ভয়ে ভয়ে পেছনে ছড়িয়ে থাকা আধো অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে নিয়ে ফের মিনমিন করে বলল, “কিন্তু ওখানে তো লক্ষ বলি হয়ে কবন্ধ হয়েছে। রামনাম করলে সে যাবে না তো।”
“জানি। সে ব্যবস্থাও আছে। গত সোমবারে রাতে মামাবাড়ি গিয়েছিলাম না! সেদিন রাতে মামি ভয়ের স্বপ্ন দেখে বটুক-ভৈরবের মন্ত্র পড়ছিল বই খুলে। পরে বলল সে মন্ত্রের নাকি এমন জোর যে সঙ্গে থাকলে দশ মাইলের মধ্যে ব্রহ্মদৈত্যও আসতে পারে না। সকালে উঠে বইটা খুলে কাগজে মন্ত্রটা লিখে নিয়েছিলাম। সেটা সঙ্গে আছে এই দেখ। কবন্ধ আমাদের সামনেই আসতে পারবে না!” বলতে বলতে ফ্রকের পকেট থেকে বের করে একখণ্ড কাগজ দেখাল সে ভাইটিকে।
“আমায় দিবি?”
ভাইয়ের ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া টুকটুকে মুখটা দেখে বুঝি একটু দয়াই হল দিদির। আহা রে! সত্যিই তো! ভাইয়ের যদি কিছু হয়ে যায়! তাড়াতাড়ি কাগজের টুকরোটা নিয়ে যত্ন করে সে সৌম্যর পকেটে ভরে দিল।
“আর তুই?”
“আমার কিচ্ছু হবে না। শুধু তুই আমাকে ছুঁয়ে থাকিস একটু। হ্যাঁ ভাই?”
জটেশ্বরীর থান জায়গাটা কতকাল আগের তা কেউ জানে না। লোকে বলে এককালে নাকি কাপালিকরা নরবলি দিত ওখানে। বিরাট আটচুড়ো মন্দিরও ছিল নাকি মা জটেশ্বরীর নামে। এখন একটা পাথর বাঁধানো চাতালের একপাশে তার ভাঙাচোরা অবশেষ পড়ে আছে শুধু ঘন জঙ্গলের মধ্যে। এই ভোরবেলা গছেদের ভিড় পেরিয়ে সেখানে আবছা আলো ফুটেছে কেবল। ঝরে পড়া শিউলি ফুলে সাদা হয়ে আছে চাতালের চারপাশ। কুয়াশা আর শিউলি ফুলের গন্ধ মিশে গিয়ে হালকা, মিষ্টি গন্ধ উঠছে। চাতালের মাঝামাঝি গোড়া-বাঁধানো দুটো প্রকাণ্ড স্থলপদ্মের ঝোপে গোলাপি রঙের বড় বড় ফুল ফুটে আছে। তাদের পাপড়িতে জমে ওঠা কুয়াশা টুপটাপ শব্দ তুলে ঝরে পড়ছিল স্থলপদ্মের পাতায়।
ফুল কুড়োতে কুড়োতে, উপচে সাজিটা দেখিয়ে সৌম্য বলল, “বড় একটা ঝুড়ি নিয়ে এলে ভালো হত, বল?” ফ্রকের কোঁচড়ে রাখা স্থলপদ্মগুলো সামলাতে সামলাতে টুকি গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ল, “বেশি লোভ করিস না। মা জটেশ্বরীর ফুল। নিতান্ত মা দুগ্‌গার জন্য নিতে এসেছি, তাই কিছু বলছে না। নইলে দেখতি এতক্ষণে—”
“কিচ্ছু হত না। তুই হলি একটা ভীতু!” বলতে বলতে সাজিটা মাটিতে নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল সৌম্য। সকালবেলার স্পষ্ট নরম আলোয় ততক্ষণে জটেশ্বরীর চাতালের সব রহস্যকে মুছে দিয়েছে। এখানে আসবার আগে নিজের ভয় পাবার কথা ভেবে হাসিই পাচ্ছিল সৌম্যর। টুকি সাবধানী গলায় বলল, “এমন কথা বলিস না ভাই।”
“কেন? কী হবে? কবন্ধ ধরবে? হি হি— আচ্ছা দেখি কোথায় তোর কবন্ধ! জটেশ্বরীর মন্দিরে বুঝি?” বলতে বলতে একখণ্ড ইট তুলে নিয়ে সাজোরে ছুঁড়ে মারল সৌম্য ভাঙাচোরা মন্দিরটার দিকে। অমনি সকালের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে একটা গম্ভীর আওয়াজ ভেসে এল ভাঙা মন্দিরের ভিতর থেকে, “কে রে এখানে, আমায় বিরক্ত করছিস?”
“ও ভাই— কবন্ধ— পালা রে!” বলতে বলতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট দিল টুকি। তার কোঁচড় থেকে স্থলপদ্ম ফুলের রাশি ছিটিয়ে পড়ছিল তার পালাবার পথের দুপাশে। শিউলি ফুলের সাজিটাকে দুহাতে বুকের কাছে চেপে ধরে তার পেছন পেছন ছুটছিল সৌম্য। অতগুলো ফুল সে কিছুতেই ফেলে যেতে রাজি নয়। এমনকী কবন্ধতে ধরলেও নয়।
তারা চোখের আড়ালে চলে গেলে ভাঙা মন্দিরের থেকে পাগল মানুষটা বের হয়ে এলেন। লম্বা একহারা চেহারা। কাঁধের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে কাঁচাপাকা চুল। সেই কবে বাংলা ভাগ হবার পর ভাসতে ভাসতে এসে পড়েছিলেন এই দেউল গ্রামে, আর ফিরে যাননি। পণ্ডিত মানুষ। এ গ্রামের অনেক মানুষই তাঁর কাছে ছেলেবেলায় ইংরেজি আর বিজ্ঞানের পাঠও নিয়েছে। তবে এখন আর তাঁর সেসব বিদ্যা মনে পড়ে না বিশেষ।
এ গ্রামের সবাই তাঁকে হেমন্তকাকা বলে ডাকে। সবার বাড়িতেই তাঁর জন্য দরজাও খোলা থাকে। কিন্তু তবু, চাল-নেই-চুলো-নেই মানুষটা কখনও শুয়ে থাকেন ইস্কুলঘরের বারান্দায়, কখনও বটতলার নীলকণ্ঠের দেউলের চাতালে। মাঝে মাঝে কারও বাড়িতে এসে বলেন, “আজ আমায় দুটি খেতে দিও তোমরা।” লোকে খুশি হয়েই দেয়। অন্যসময় কোথায় কীভাবে যে খাওয়া জোটে তাঁর কে জানে!
উপস্থিত কদিন এই নির্জন জঙ্গলের মধ্যে জটেশ্বরীর মন্দিরে এসে বাসা করেছেন তিনি। গাছে ঘেরা, চুপচাপ জায়গাটা বড় ভালো লেগে গেছে তাঁর। এখানে মানুষের গলা শোনা যায় না। টুকির ফেলে যাওয়া ফুলগুলো একে একে যত্ন করে ধুলো থেকে কুড়িয়ে নিতে নিতে আপনমনেই বিড়বিড় করছিলেন হেমন্ত। তাঁর ঝাপসা স্মৃতিকে উসকে দিয়ে গেছে ফুল ছিটিয়ে ছুটে যাওয়া মেয়েটার ছবি। এই মুহূর্তে, কোনও ভুলে যাওয়া শহরের এক কলেজের বিরাট ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে আছেন যেন তিনি। তাঁর সামনে গ্যালারি জুড়ে বহু ছেলেমেয়ের ভিড়। ডায়াসের ওপর পায়চারি করতে করতে খোলা গলায় তিনি আবৃত্তি করে চলেছেন লাস্ট ডেজ অব পম্পেইয়ের ফুলওয়ালি নিদিয়ার সেই অবিস্মরণীয় গান— “ইফ দা আর্থ বি অ্যাজ ফেয়ার অ্যাজ আই হিয়ার দেম সে, দিজ ফ্লাওয়ার্স হার চিলড্রেন আর—”

* * *

“ফুল দিয়ে এসেছিস?”
“হ্যাঁ মা। জানো, আমরা এবারে সবচেয়ে বেশি ফুল দিয়েছি। আর সবাই এই কটা কটা করে ফুল এনেছে, আর আমরা—” দুপাশে হাত ছড়িয়ে তাদের জোগাড় করা ফুলের পরিমাণ মাকে বোঝাচ্ছিল সৌম্য।
“অত ফুল! পেলি কোথায়? কোনদিকে গেছিলি আজ?” অভয়া টুকির দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন একবার।
“ওই তো গয়লা পুকুর ছাড়িয়ে, ওই দিকে—” জটেশ্বরীর থানের কথাটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টায় ছিল টুকি। কিন্তু সৌম্যকে আটকানো গেল না। তার ছোট্ট জীবনে আজকের মতো এত বড় ঘটনা আর ঘটেনি কখনও। গল্পটা অনেকক্ষণ ধরে ফুলে ফেঁপে উঠছিল তার ভিতরে। নেহাত দিদির ভয়ে সে চুপ করে ছিল এতক্ষণ। এইবারে হুড়মুড় করে সব কথা বের হয়ে এল তার মুখ থেকে।
অভয়া খুব মন দিয়ে শুনছিলেন তার কথা। ভূতপ্রেতে তাঁর বিশ্বাস নেই কোনও কালে। হয়তো কোনও ভিখিরিটিকিরি এসে আস্তানা করেছে ওখানে। তবে দিনকাল ভালো নয়। কোত্থেকে কখন কী হয়ে যায় কে জানে! তিনি ঠিক করলেন, ব্যাপারটা আজ হাসপাতাল যাবার পথে ক্লাবে বাবলুদের জানিয়ে যেতে হবে। গিয়ে দেখে নিক একবার ছেলেপিলেরা মিলে। মুখে অবশ্য সেসব কিছু প্রকাশ না করে কড়া চোখে টুকির দিকে ফিরে বললেন, “কেন গেছিলি ওখানে? নিজে তো একটা ঘুরণচণ্ডি হয়েইছ, এখন ভাইটাকেও দলে টানছ।”
“আমি তো মা দুগ্‌গার জন্যই ফুল তুলতে—” বলতে বলতেই মায়ের রাগী চোখের দিকে তাকিয়ে সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “আর যাব না।” উঁচিয়ে ধরা তালপাতার পাখার ডাঁটিটা নামিয়ে নিতে নিতে অভয়া বললেন, “কথাটা মনে থাকে যেন। এখন যাও, হাতমুখ ধুয়ে এসে খেয়ে নাও। তারপর মণ্ডপে গিয়ে বসো দুজনে। আমায় বের হতে হবে।”
বিরাট অশ্বত্থ গাছের নীচে উঁচু বেদিতে নীলকণ্ঠের দেউল। সেই দেউলের নামেই গ্রামের নাম নাকি। বেদির নীচে মাঠের ওপর দুর্গাপুজোর মণ্ডপ হয়েছে। ঘাড় উঁচু করে দেখতে হয়, এত বড় মণ্ডপ। গত প্রায় একমাস ধরে সেখানে তৈরি হয়েছে দেউলগ্রামের বিখ্যাত ‘একুশ হাত উচ্চ’ দুর্গাপ্রতিমা। বড় বড়, শান্ত চোখদুটি মেলে দেবী চেয়ে আছেন নীচের দিকে। অসুরের চুলের মুঠি ধরে আছেন বটে, কিন্তু তাকে মারবার খুব একটা ইচ্ছে আছে বলে মনে হচ্ছে না। মুখখানা খুব হাসিহাসি আর মায়াবী। সেইদিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে সৌম্য হঠাৎ বলল, “আচ্ছা, যদি সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী, তিনদিনই সবার চেয়ে বেশি ফুল এনে দিই তাহলে মা দুগ্‌গা সেই বরটা দেবে তো?”
“বর দেবে না আরও কিছু। কে বলেছিল তোকে, মাকে সব কথা বলে দিতে? কালকে আর থানের দিকে পা বাড়াতে দেবে ভেবেছিস? সবার চেয়ে বেশি ফুল পাব কোথায়?”
কথাটার কোনও জবাব না দিয়ে ঘাড় গোঁজ করে বসে রইল সৌম্য। জোরে কখনও কাঁদে না সে। কেবল পিঠের দিকটা কেঁপে কেঁপে উঠছিল তার। সেইদিকে চোখ পড়তে তাড়াতাড়ি পাশে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরে টুকি বলল, “এই দ্যাখো। অমনি কান্না শুরু হয়ে গেল। আচ্ছা ছিঁচকাঁদুনে হয়েছিস তো তুই? একটু কিছু বলেছি-কী-না-বলেছি, অমনি—”
সৌম্য মাথা নিচু করে রেখেই বলল, “কিন্তু বাবা যে…”
হঠাৎ ঠিক যেন মায়ের মতো বড় হয়ে গেল টুকি। চার বছরের ছোট ভাইটিকে জড়িয়ে ধরে বলল, “কিচ্ছু ভাবিস না তুই। জটেশ্বরীর থানে না যেতে দিল তো বয়েই গেল। আমার ওরকম আরও অনেক জায়গা জানা আছে। মানত যখন করেছি, তখন তিনদিন ধরে ঠিক সবার চেয়ে বেশি ফুল জুটিয়ে এনে দেব। তুই দেখে নিস! আর বাবাও ঠিক ভালো হয়ে ফিরবে।”
“ঠিক যাবি?” সৌম্যর চোখমুখে মেঘরৌদ্রের খেলা। ঢাকে আগমনীর বোল ফুটেছে। বড় ঠাকুরের পায়ের কাছে বসানো ছোট্ট তিন হাত উঁচু প্রতিমাকে ফুলের মালায় ঢেকে দিয়ে রামানন্দ ঠাকুর নিমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন দেবীকে— “ইহাগচ্ছ, ইহাগচ্ছ, ইহ তিষ্ঠ, ইহ তিষ্ঠ, অত্রাধিষ্ঠানং কুরু মম পূজা গৃহাণাম—”
রাতে মায়ের গা ঘেঁষে শুয়ে সৌম্য জিজ্ঞাসা করল, “মা, বাবা কেমন আছে?”
অভয়া চুপ করে রইলেন। এর কী উত্তর দেবেন তিনি? দাদা বলেছিলেন, “ছেলেমেয়েকে লুকোস না। ডাক্তার যা বলেছে তাতে আর বড়জোর দু-তিন মাস। ওদের তৈরি হতে দে। নইলে হঠাৎ করে আঘাতটা বড় বাজবে।” কিন্তু প্রাণে ধরে কাজটা করতে পারেননি অভয়া। পারবেনও না। যে কদিন এড়িয়ে চলা যায়।
অন্ধকারের মধ্যে ছেলের গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “ভালো আছে। ডাক্তার বলেছে আর কিছুদিনের মধ্যে ছেড়ে দেবে। তখন আবার সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে দেখিস!”
“ভাসানের আগে আসবে?”
“না। অত তাড়াতাড়ি কী করে হবে বোকা?”
“কালীপুজোর আগে?”
“ছেড়ে দিতেও পারে। কালকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে আসব ডাক্তারবাবুকে।”
“আমায় নিয়ে যাবে কাল?”
“না। পুজোর মধ্যে ছোটদের হাসপাতালে যেতে নেই বাবা। তাছাড়া, কাল যাবি কী করে? কাল চৌধুরিবাড়িতে দুপুরে অষ্টমীর নেমন্তন্ন না?”
অমনি ছবিগুলো চোখের সামনে যেন সিনেমার মতো ফুটে ওঠে তার। চৌধুরিদের টিন-ছাওয়া বেড়ার পুজোবাড়িতে একচালা মা দুর্গা। লালচে-হলুদ চকচকে রং, টানাটানা চোখ, গা ভরতি গয়না, পায়ের নীচে সিংহ আর সবুজ রংয়ের মহিষাসুর, ধুনোর ধোঁয়া, ঢাকে বলির বাজনা, তারপর টানা বারান্দায় বসে ধোঁয়া ওঠা বলির মাংসের ঝোল দিয়ে সরু চালের ভাত—
আস্তে আস্তে, হাসপাতাল নামের কোনও অজানা জায়গায় শুয়ে থাকা তার বাবার ছবিটাকে পেছনে ঠেলে দিয়ে, সেই আনন্দের ছবিগুলো তাকে ঘিরে ধরল এসে। ঠোঁটদুটি সামান্য ফাঁক করে সে ঘুমোয়। ঠান্ডায় একটু কুঁকড়ে আছে। পরনের শাড়ির আঁচলটা তার গায়ের ওপর বিছিয়ে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে শুলেন অভয়া। পেছন থেকে টুকি চার হাত-পায়ে তাঁকে আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়েছে। দূরে কোথাও মাইক বাজছে কোনও মণ্ডপে। অভয়া অন্ধকারে একা একা জেগে রইলেন।

[ক্রমশ]

ছবি — পার্থপ্রতিম দাস

To Top