320px-jupiter_smyrna_louvre_ma13

আমাদের দেবতাদের রাজা যেমন ইন্দ্র বা পুরন্দর তেমনই গ্রিক দেবতাদের রাজা ছিলেন জিউস। আর রোমানরা তার নাম দিয়েছিল জুপিটার। সেই জিউসের জন্ম ও রাজা হওয়ার কাহিনি এবার শুনব। জিউস ছিলেন স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালের রাজা। জিউস রাজা হওয়ার অনেক অনেক আগে অলিম্পিয়াতে রাজত্ব করত ক্রোনাস। ক্রোনাসের মেজাজ ছিল ভয়ংকর আর তার গায়ে জোরও অপরিসীম।
জন্মের পর সে তার ছেলেপিলেদের খেয়ে ফেলত। খুব কান্নাকাটি করতে করতে তারা তার অন্ধকার গলরন্ধ্র দিয়ে তার পেটের মধ্যে অদৃশ্য হত। তোমরা প্রশ্ন করতে পারো, ক্রোনাস এমন করত কেন?
তার কারণ এক ভবিষ্যদ্বাণী। সেজন্যই ক্রোনাস সব সময়ে ভয়ে ভয়ে থাকত। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, ক্রোনাসের ছেলেমেয়েরা এক দিন তার সিংহাসন কেড়ে নেবে।
ক্রোনাসের ভাবনা ছিল, যদি কোনও ছেলেমেয়েই না থাকে, তাহলে আমিই চিরকাল রাজত্ব চালাব। কেউ আমার সিংহাসন কেড়ে নিতে পারবে না। সে তার স্ত্রী রেয়াকে বুঝিয়ে বলেছিল, “যদি ছেলেমেয়ে আদৌ না থাকে তাহলে ভবিষ্যতবাণী সত্যি হবে কী করে? দরকার নেই, আমরা ছেলেমেয়ে ছাড়াই থাকব।”
ফলে রেয়ার ভারী মন খারাপ থাকত। চিরটাকাল ছেলেমেয়ে ছাড়া থাকার কল্পনাটা তার কাছে একটুও সুখকর মনে হয়নি। কিন্তু রেয়া ক্রোনাসকে খুবই ভালোবাসত, তাই সে কোনও কথা বলেনি।

যাই হোক, রেয়া তো প্রায়ই অন্তঃসত্ত্বা হত। আর প্রতিবার সে ভাবত যে, এইবার হয়তো ক্রোনাসের মনে একটু দয়া হবে। সে এবারের শিশুটিকে গিলে খাবে না। কিন্তু সে খুব ভুল ভাবত। প্রতিবারই ক্রোনাস সদ্যজাত শিশুটিকে গিলে ফেলত। রেয়ার পক্ষে সে ছিল এক ভয়াবহ কাণ্ড। কিন্তু একটা সান্ত্বনা তার ছিল, তা হল যে তার তার ছেলেমেয়েরা তো দেবতা। আর দেবতাদের মৃত্যু নেই। একবার জন্মালে তারা চিরকাল বেঁচে থাকে। ফলে রেয়ার সন্তানেরা তাদের বাবার মস্ত পেটের মধ্যেই বেঁচে থাকত। ক্রোনাসের পেটে জায়গা তো কিছু কম ছিল না। তারা কেবল তেমন বাড়তে পারত না। কিন্তু তারা ওখানে খেলা করত, গল্প করত আর অপেক্ষা করত; অপেক্ষা করত যে তাদের একদিন কেউ এখান থেকে মুক্ত করবে। এইভাবে শত বছর কেটে গেল।
রেয়া এক সময় বুঝতে পারল সে আবার সন্তানের জন্ম দেবে। তার মনে ভারী আনন্দ হল। সেবার সে একটা জিনিস আগেই স্থির করল। সে ভাবল, “এবার আমি লুকিয়ে থাকব। আমাকে খুঁজে না পেলে ক্রোনাস শিশুটিকে তো আর গিলে খেতে পারবে না। তাহলে আমার ছেলে আমারই থাকবে। আর বড় হবে।” তাই ছেলে হবার সময়ে সে ক্রিট নামে একটা দ্বীপে পালাল। সেখানে ইডা পাহাড়ের এক গুহায় সে লুকিয়ে থাকল।
কিন্তু কিছুদিন পরেই ক্রোনাস বিপদের গন্ধ পেল। “এ কী আমার বউ কোথায়? সে হঠাৎ উবে গেল কোথায়, আমাকে একটা কথাও না জানিয়ে?” নিজেকেই জিজ্ঞাসা করল সে। “তাহলে নিশ্চয়ই তার আবার সন্তান হবে।” তখন সে রেয়াকে খুঁজতে বের হল। কিন্তু কোথাওই খুঁজে পেল না। রেগে তামাম বিশ্ব সে তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কিন্তু দুনিয়া থেকে রেয়া যেন লুপ্ত হয়ে গেছে! ফলে রেয়া বেশ নিশ্চিন্তে প্রসব করল। এক দেবতার জন্ম হল। তার নাম জিউস। ছোট্ট খোকা জিউসের সবে কয়দিন মাত্র বয়স। তখন ক্রোনাস সেই গুহার সামনে এসে দাঁড়াল, “আবার একটা হতভাগার জন্ম হল বুঝি? এইখানে এসে?” গর্জন করে উঠল সে। “কই? আমি দেখি তাকে একবার।”
রেয়া কিন্তু এবার তৈরি ছিল। সে জানত ক্রোনাস এক সময় তাকে খুঁজে পাবে। তাই সে রক্তাক্ত এক পুঁটলিতে জড়ানো এক পাথর তার দিকে এগিয়ে দিল। ক্রোনাস সেটা বেজায় খুশিতে গিলে ফেলল। তবে কিনা বিপদ তখনও যায়নি। ক্রোনাস এইবারে রেয়াকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইল। একেবারে তক্ষুনি। রেয়া আর কী করে? তাকে যেতে হল। একটু পথ গিয়েই রেয়া বলল, “তুমি বরং আগে আগে যাও। আমি পরে আসছি। আমার কিনা সবে বাচ্চা হল, তাই আমি এখন বড় দুর্বল।” বলে রেয়া ঘাসের উপর বসে পড়ল। ক্রোনাস রাজি হয়ে এগিয়ে যেতেই রেয়া দৌড়ে গুহায় ফিরে গেল। খুব দ্রুত ভেবে ফেলল সে, কে শিশু জিউসের দেখাশোনা করবে।
গুহার খুব কাছে ছিল একটা ছোট্ট নদী। সেখানে কিন্নররা খেলা করত। তারা হঠাৎ শুনতে পেল একটি শিশু কাঁদছে। দৌড়ে তারা গুহার ভিতরে গেল। এক কিন্নরী যেই শিশুকে কোলে নিয়ে দোল দিতে শুরু করল। অমনি দেবী রেয়া অকস্মাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াল।
“আমার পুত্র জিউসের দেখাশোনা আর যত্ন কোরো।” সে কিন্নরীকে বলল। “একদিন তিনি জগত শাসন করবেন। এখন আমি তোমাকে এক স্বর্গীয় মেষে রূপান্তরিত করব, যাতে তুমি তাকে দুধ, মধু আর অমৃত পান করাতে পারো।”
কিন্নরী বলল, “আপনার অনুগ্রহ হে দেবী। আমি আপনার ছেলের দেখাশোনা করব, কথা দিচ্ছি।” রেয়া তাই করল। সেই কিন্নরীকে সে এক সুন্দর সাদা মেষে পরিণত করল আর নাম দিল আমালথেয়া। গ্রিক ভাষায় তার অর্থ স্বর্গীয় সাদা মেষ।
সেই মেষ শিশুর পাশে খড়ের উপর শুল আর শিশুটিকে তার দুধ খাওয়াতে শুরু করল। তার দুটি শিং থেকে মধু আর অমৃত বেরিয়ে আসত শিশু জিউসের জন্য। মৌমাছিদের একটা বড় ঝাঁকও শিশু জিউসের যত্ন নিতে শুরু করল। তারা জিউসের জন্য পাহাড় থেকে মধু আহরণ করে নিয়ে আসত। জিউস প্রতিদিন বড় আর শক্তিশালী হয়ে উঠতে লাগল।
ওই সময় জিউস কাঁদলে ক্রোনাস যাতে শুনতে না পায় সে জন্য রেয়া ছোট ছোট আত্মাদের কোলাহল করার জন্য ওখানে পাঠাত। তারা ওখানে বাজনা বাজাত, তারস্বরে গান করত আর সেই শব্দে জিউসের কান্না চাপা পড়ে যেত। একবার ক্রোনাসের সন্দেহ হল। সে ভাবল, কারা ওখানে গুহার মধ্যে শোরগোল করে? সে নিজে গুহার মধ্যে ঢুকতে পেল না, কারণ বিশাল তার দেহ। হাঁটু গেড়ে বসে সে গুহার মধ্যে মাথা গলাল।
গুহার ভিতরে অন্ধকারে সে কিছু দেখতে পেল না। আর তার চোখ অন্ধকারে সয়ে আসার আগেই আমালথেয়া এক লাফে তার সামনে এসে উপস্থিত। শিং দিয়ে সে ক্রোনাসকে বেদম ঢুঁসিয়ে দিল। বিষম ব্যথা হাতে ক্রোনাস সেখান থেকে চিৎকার করে পালাল।
ঢুঁসাতে গিয়ে আমালথেয়ার একটি শিং ভেঙে গেল। সেটি হল উপকথার সেই ‘কল্পশৃঙ্গ’। তার কাছে যা চাওয়া যায় তাই মেলে। তার মালিক যা ইচ্ছা করে বারে বারে সেই শৃঙ্গ নিজে থেকে পূর্ণ হয়ে তার সেই ইচ্ছে পূর্ণ করে। তা সে সোনাই চাও অথবা শ্রান্তিহরা মদিরা।

আমালথেয়ার যত্নে জিউস অল্প দিনের মধ্যে বলশালী আর বিশাল হয়ে উঠল। এবার সে ক্রোনাসকে সিংহাসন থেকে নামানোর তোড়জোড় শুরু করল। ভবিষ্যদ্বাণী সফল করতে হবে। তাই জিউস আগে সঙ্গীসাথি সংগ্রহ করতে শুরু করল ক্রোনাসকে পরাজিত করার জন্য। সে তার মা রেয়ার সঙ্গে গোপনে দেখা করল। রেয়া জানাল, “তোমার ভাই বোনেরাই তোমার সবচেয়ে ভালো সাথি হবে। তোমার ভাই পসেইডন আর হাডেস। আর তোমার তিন বোন আছে, হেরা, সেসটিয়া আর ডেমিটার। ক্রোনাস তাদের অনেক দিন আগে খেয়ে ফেলেছিল। এখন ওকে তাদের উগরে দিতে হবে। তুমি দানবী মেটিসের সঙ্গে কথা বলো। সে সবচেয়ে বুদ্ধিমতী আর সে ভবিষ্যদ্বাণীর কথাও জানে। সে তোমাকে সাহায্য করবে।”
মেটিস জিউসকে সাহায্য করতে রাজি হল। সে বলল, “খুব ভালো কথা যে, তুমি আমার কাছে এসেছ। এখন ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হবার সময় হয়েছে। অনেকদিন হল ক্রোনাস সারা বিশ্বজগতকে কষ্ট দিচ্ছে। এইবার সে যখন দেবতাদের ভোজসভা ডাকবে, তখন আমি তোমাকে পথ বলে দেব। তুমি সে সময় ওখানে কাছেই লুকিয়ে থেকো।”

তাই হল, দেবতাদের ভোজসভার সময় জিউস সভার খুব কাছেই লুকিয়ে রইল। আর তখন মেটিস ক্রোনাসের আহার্যে এমন এক ভেষজ মিশিয়ে দিল যাতে সে বমি করতে বাধ্য হল। বমির ফলে হাডেস, পোসাইডন আর বাকি ভাই বোনেরা এমনকী সেই পাথরটা, যেটা ক্রোনাস জিউস ভেবে গলাধঃকরণ করেছিল – সব বাইরে বেরিয়ে এল।
আর জিউস, হাডেস, পোসাইডন আর বাকি তিন বোন হেরা, হেস্টিয়া আর ডেমেটার সকলে ক্রোনাসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হল ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। সারা পৃথিবী কাঁপতে শুরু করল। সমুদ্রে উঠল প্রবল ঢেউ। কিন্তু ক্রোনাসকে পরাজিত করা দুঃসাধ্য। সে একা লড়াই করছিল না। তার সঙ্গী দৈত্যরা তার সাহায্যে ছুটে এল। আবার জিউস আর তার ভাইবোনদের সাহায্যেও অনেকে এসে ছিল। তিন সাইক্লোপ আর তিন শতবাহু দৈত্য তাদের পক্ষে যুদ্ধ করল। আর দুই দানব কারিগর জিউসকে যুদ্ধ করার জন্য বজ্র ও বিদ্যুৎ বাণ গড়ে দিল। দশ বছর যুদ্ধ চলল। তারপর অবশেষে বিদ্যুৎ আর বজ্রের আঘাতে বিপর্যস্ত ক্রোনাস ও তাদের সঙ্গী দৈত্যদের শক্তি শেষ হল।
পাতালকে গ্রিকরা ডাকত তার্তারোস নামে। জিউস ক্রোনাস আর তার সঙ্গী দৈত্যদের তার্তারোসের গভীর অন্ধকারে বন্দী করে শতবাহু দৈত্যদের সেখানে পাহারা দেবার হুকুম দিল। যুদ্ধ শেষ হল। শান্তি এল। শুরু হল এক নতুন সময়। পৃথিবী আবার শ্বাস নিতে পারল শান্তিতে।
জিউস সারা বিশ্ব ও অলিম্পিয়ার শাসক হল। সে পৃথিবী শাসনের ভার তার দুই ভাই পোসাইডন আর হাডেসের মধ্যে ভাগ করল। স্বর্গে অলিম্পাসের চূড়ায় তার নিজের সিংহাসনের স্থান নির্দিষ্ট হল। সে সেখানে নিজের আর বারোজন গুরুত্বপূর্ণ দেবতার প্রাসাদ নির্মানের আদেশ জানাল। আর গভীর ভালোবাসায় আর কৃতজ্ঞতায় জিউস আমালথেয়াকে অবিস্মরণীয় করে রাখার জন্য তাকে এক তারামণ্ডলে রূপান্তরিত করে আকাশে স্থান দিল। রাত্রে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখো – সেখানে তুমি ক্যাপ্রিকর্ণ বা মেষরাশি জ্বলছে নিভছে দেখতে পাবে।

চিত্রসূত্রঃ উইকিপিডিয়া

To Top